Search
Close this search box.

ওরাল ক্যান্সার কেন হয়, রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা

ওরাল ক্যান্সার কি ?

মুখের ভেতরে বা বাইরে যে কোনও অংশে কোষের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি ফেসিয়াল বা ওরাল ক্যান্সার বলে অভিহিত হয়। মেয়েদের তুলনায় পুরুষদের মধ্যে এই ক্যান্সারের প্রকোপ অনেক বেশি। তামাক ও তামাকজাত পণ্য সেবন মুখে ক্যান্সার হওয়ার অন্যতম কারণ। তবে আরো কয়েকটি কারণও রয়েছে। জিভ, দাঁত, টাগরা, মুখের ওপরের দেওয়াল, গাল এবং ঠোঁটের ক্যান্সার মুখের ক্যান্সারের অন্তর্ভুক্ত। দাঁতে কোনও অস্বাভাবিকতা থাকলে ডেন্টিস্ট বুঝতে পারেন। সে জন্য নিয়মিত ডেন্টিস্টের কাছে গেলে দাঁতের ক্যান্সার টের পাওয়া যেতে পারে।

ওরাল ক্যান্সারের কারণ

মুখের যে কোনও অংশের কোষের ডিএনএ’র ভেতরে মিউটেশনের প্রতিক্রিয়ায় মুখে ক্যান্সার হয়। মিউটেশনের জেরে অকেজো হয়ে যাওয়া এই কোষগুলি অস্বাভাবিক দ্রুত হারে বৃদ্ধি পায়, সুস্থ কোষগুলিকে হত্যা করে এবং দেহের মারাত্মক ক্ষতি করে। অস্বাভাবিক কোষগুলি জমাট বেঁধে টিউমার তৈরি করে যেটি ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ে় এবং ক্যান্সারে পরিণত হয়।

ওরাল ক্যান্সার সাধারণত পাতলা এবং সমতল কোষ থেকে শুরু হয় যা স্কোয়ামাস কোষ নামে পরিচিত। এই স্কোয়ামাস কোষগুলি ঠোঁট ও মুখের ভিতরে একটি আস্তরণের মতো বিছিয়ে থাকে। বেশিরভাগ মুখের ক্যান্সার প্রধানত স্কোয়ামাস সেল কার্সিনোমা। মুখের কোষে মিউটেশনের কারণ একদম স্পষ্ট বোঝা না গেলেও, কয়েকটি ব্যাপার এই ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

ধূমপান অর্থাৎ বিড়ি সিগারেট পাইপ খাওয়া, পানমশলা গুটখা খাওয়া, অতিরিক্ত মদ্যপান অতিরিক্ত সূর্যালোকের সংস্পর্শে আসা হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাসের (এইচপিভি) সংক্রমণ যা যৌন মিলনের ফলে ছড়িয়ে পড়ে।

ওরাল ক্যান্সার রোগ নির্ণয়

১. এক্স রে- ক্যান্সার মুখমন্ডল, বুকে বা ফুসফুসে কতটা ছড়িয়ে পড়েছে দেখার জন্য এক্স রে করা হয়।

২. সিটি স্ক্যান – মুখ, ঠোঁট, গলা বা ফুসফুসে টিউমারের উপস্থিতি জানতে সিটি স্ক্যান করা হয়।

৩. এম আর আই স্ক্যান- ক্যান্সারের পর্যায় (স্টেজ) এবং মুখ ও গলার প্রকৃত অবস্থা বোঝার জন্য এম আর আই করা হয়।     

চিকিৎসা পদ্ধতি

ওরাল ক্যান্সারের চিকিৎসা নির্ভর করে তার ধরন, অবস্থান, পর্যায় ইত্যাদি বিষয়ের ওপর। প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে অনেক রোগীর ক্ষেত্রে ব্যাধি নিয়ন্ত্রণ করতে খুব বেশি সময় লাগে না। তবে সে ক্ষেত্রে রোগীর বয়সও জরুরি বিষয় হয়ে ওঠে।আমেরিকার ন্যাশনাল ক্যান্সার ইনস্টিটিউট -এর একটি গবেষণা থেকে দেখা গিয়েছে, ওরাল ক্যান্সারের ষাট শতাংশ রোগী পাঁচ বছর বা তারও বেশি সময় বেঁচে থাকেন। যত দ্রুত ক্যান্সার নির্ণয় করা যায় এবং চিকিৎসা শুরু করা হয়, সেই অনুপাতে রোগীর দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকার সম্ভাবনাও বাড়ে।এমনকি প্রথম এবং দ্বিতীয় পর্যায়ের রোগীদের ক্ষেত্রে এই হার সত্তর থেকে নব্বই শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট যে ঠিক সময়ে ক্যান্সার নির্ণয় এবং চিকিৎসা শুরু হওয়া কত জরুরি। ওরাল ক্যান্সার সারানোর তিনটি উপায় রয়েছে- প্রথমত সার্জারি, দ্বিতীয়ত কেমোথেরাপি, তৃতীয়ত রেডিওথেরাপি।

i. সার্জারি- চিকিৎসা :- ক্যান্সার ছড়িয়ে না পড়ে থাকলে বা টিউমার ছোটো হলে সার্জারি কাজে আসে। এজন্য ওরাল ক্যান্সার হলে প্রাথমিক অবস্থায় চিকিৎসা শুরু করা উচিৎ। 

কিন্তু ক্যান্সার ছড়িয়ে গেলে সার্জারি করে সারানো সম্ভব নয়। তখন কেমোথেরাপি বা রেডিওথেরাপি দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা যায় কিন্তু পুরো সারিয়ে তোলা সম্ভব নয়। চিকিৎসার প্রাথমিক পর্যায়ে সাধারণত সার্জারির মাধ্যমে টিউমার বা কারসিনোজেনিক লিম্ফ নোড (Carcinogenic lymph nodes) অপসারণ করা হয়। কোনও কোনও ক্ষেত্রে একই সঙ্গে মুখ ও গলার আশপাশের টিস্যুও বাদ দেওয়া হয়। কারো কারো স্বরযন্ত্র বাদ দিতে হয়।

ii. রেডিয়েশন থেরাপি :- রেডিয়েশন থেরাপি এই চিকিৎসার আরেকটি পথ। রোগীর অবস্থা বিচার করে সপ্তাহে দু বা পাঁচ  দিন করে দুই সপ্তাহ থেকে আট সপ্তাহ পর্যন্ত এই থেরাপি চলতে পারে। ক্যান্সার অনেকটা ছড়িয়ে পড়ে থাকলে রেডিয়েশন থেরাপির সঙ্গে একযোগে কেমোথেরাপির দরকার হতে পারে। রেডিয়েশন থেরাপির কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও আছে। সেগুলি নিচে উল্লেখ করা হল–

১) মুখে ঘা।

২) মুখ শুকিয়ে আসা।

৩) দাঁত ক্ষয়ে যাওয়া।

৪) মাড়ি থেকে রক্ত পড়া।

৫) বমি বমি ভাব এবং বমি হওয়া।

৬) চামড়া এবং মুখের বিভিন্ন সংক্রমণ। 

৭) অবসাদ।

৮) স্বাদ এবং গন্ধ নিতে অপরাগতা ইত্যাদি।

iii. কেমোথেরাপি :- রাসায়নিক ওষুধপত্রের মাধ্যমে দেহের ক্যান্সার আক্রান্ত কোষগুলোকে নষ্ট করে দেওয়ার পদ্ধতিকে কেমোথেরাপি বলা হয়। সেই ওষুধ মুখে খাওয়ারও হতে পারে অথবা ইঞ্জেকশনের মাধ্যমেও ধমনীতে ঢুকিয়ে দেওয়া যেতে পারে। রোগীর দৈহিক অবস্থা বুঝে কেমোথেরাপির নিদান দেওয়া হয়। বাসাল সেল কার্সিনোমা ও সামগ্রিকভাবে মুখের ক্যান্সার আটকাতে কেমোথেরাপির অঙ্গ হিসেবে সিসপ্ল্যাটিন, ৫- ফ্লুরৌরাসিল অথবা ডোক্সোরুবিসিন জাতীয় ওষুধ ইন্ট্রাভেনাস ইনফিউশন (আই ভি) পদ্ধতিতে রোগীর দেহে প্রয়োগ করা হয়। এর কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে –

১) চুল পড়া।

২) মুখ এবং মাড়িতে ব্যথা।

৩) মাড়ি থেকে রক্ত পড়া।

৪) রক্তাল্পতা।

৫) দুর্বলতা।

৬) ক্ষুধামন্দা।

৭) বমি বমি ভাব।

৮) ডায়রিয়া ইত্যাদি।

ফেসিয়াল ক্যান্সারের চিকিৎসা শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও রোগীকে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতে হবে। রোগের ফিরে আসা আটকাতে এবং চিকিৎসার কোনও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হচ্ছে কিনা বোঝার জন্য নিয়মিত ডাক্তারের কাছে যেতে হবে।

সাবস্ক্রাইব করুন

স্বাস্থ্য সম্পর্কিত বিভিন্ন খবর, তথ্য এবং চিকিৎসকের মতামত আপনার মেইল বক্সে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন.

Table of Contents

আমাদের সাম্প্রতিক পোষ্ট গুলি দেখতে ক্লিক করুন

আমাদের বিশিষ্ট লেখক এবং চিকিৎসক