Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on telegram
Share on whatsapp

ফাইব্রয়েড বা জরায়ুর টিউমার থাকলে কি ধরনের খাবার খেতে হবে

ফাইব্রয়েড বা জরায়ুর টিউমার হল জরায়ুর ভেতর গঠিত হওয়া অস্বাভাবিক বৃদ্ধি। এদের ইউটেরাইন ফাইব্রয়েড, মায়োমাস এবং লিয়োমায়োমাস নামেও ডাকা হয়। ফাইব্রয়েড বা জরায়ুর টিউমার ক্যান্সারাস বা জীবন ঘাতক নয়, তবে এর ফলে শরীরে অনেক সমস্যা ও জটিলতা দেখা দেয়।

ফাইব্রয়েড জরায়ুর দেওয়ালের ভেতরে এবং জরায়ুর দেওয়ালের গায়ে গড়ে ওঠে। এগুলো মাসল ও অন্যান্য টিস্যু দিয়ে তৈরি হয়। এগুলো যেমন একটা বীজের আকৃতির মতো ছোট হতে পারে, তেমনি একটা টেনিস বলের সাইজের মতো বড় হতে পারে। রোগীর একাধিক বা একটিমাত্র ফাইব্রয়েড থাকতে পারে।

চিকিৎসকেরা ফাইব্রয়েড তৈরি হওয়ার সঠিক কারন জানেন না। ওভার ওয়েট বা ওবেসিটি ফাইব্রয়েড হওয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়, তেমনি কিছু পুষ্টি উপাদানের অভাবের কারণেও ফাইব্রয়েড হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

কতটা কমন এই ফাইব্রয়েডের সমস্যা

প্রায় ৮০% মহিলার জীবনে ফাইব্রয়েডের সমস্যা দেখা যায়। এই সমস্যাটা বংশগতির কারণেও হয়ে থাকে। কারোর মা বা বোনের যদি ফাইব্রয়েডের সমস্যা থাকে তাহলে সেই মহিলার ফাইব্রয়েডের সমস্যা হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। ফাইব্রয়েডের রোগলক্ষন ও সমস্যাগুলি হল—

jorayu tumor er lokkhon
  • যন্ত্রণা
  • মাসিকের সময় অতিরিক্ত রক্তপাত
  • কোষ্ঠকাঠিন্য
  • রক্তাল্পতা
  • গর্ভধারণে সমস্যা
  • গর্ভপাত

যদিও মাত্র ২০—৫০% মহিলারই ফাইব্রয়েডের রোগলক্ষন প্রকাশ পায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ফাইব্রয়েডের চিকিৎসা প্রয়োজনই হয় না। রোগীকে চিকিৎসক অপেক্ষা করার পরামর্শ দেন, দেখতে বলেন যে ফাইব্রয়েডের সমস্যা বাড়ছে কি না নাকি ফাইব্রয়েড নিজে থেকেই মিলিয়ে যাচ্ছে।

যদিও খাদ্য ফাইব্রয়েড কে সারাতে বা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, কিন্তু প্রতিদিনের খাদ্যাভ্যাস ও জীবন ধারণ পদ্ধতি ফাইব্রয়েডের ঝুঁকি কমিয়ে দেয়। খাদ্যাভ্যাস হরমোনের সমস্যা কে নিয়ন্ত্রন করে রাখতে পারে এবং হরমোনের সমস্যা নিয়ন্ত্রণে রাখলে ফাইব্রয়েডের সমস্যা কে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারা যায়। কিছু নির্দিষ্ট খাদ্য ফাইব্রয়েডের সমস্যা কে দূরে রাখতেও সাহায্য করে।

ফাইব্রয়েডের ঝুঁকি কমানোর জন্য ডায়েট ও জীবন ধারনের পরিবর্তন

খাদ্যাভ্যাস ও জীবন ধারনে বেশ কিছু পরিবর্তন আনলে ফাইব্রয়েডের ঝুঁকি কমানো যেতে পারে।

সবুজ এবং টাটকা খাদ্য

খাদ্যে প্রচুর পরিমানে কাঁচা এবং রান্না করা শাক সব্জি রাখতে হবে। এছাড়াও বিন্স জাতীয় খাদ্য এবং মাছ প্রচুর পরিমানে খাদ্যে রাখতে হবে। সমীক্ষায় দেখা গেছে যে এই ধরনের খাদ্য তালিকায় রাখলে ফাইব্রয়েডের সমস্যা বেশ কম থাকে এবং দেখা গেছে যে যাদের খাদ্যে রেড মিটের পরিমান বেশি তাদের মধ্যে ফাইব্রয়েডের সমস্যা বেশি।

অ্যালকোহল বন্ধ করা

যেকোনো ধরনের অ্যালকোহলই ফাইব্রয়েডের সমস্যা কে বাড়িয়ে দেয়। যে ধরনের হরমোনের প্রভাবে ফাইব্রয়েডের জন্ম হয়, অ্যালকোহল সেই ধরনের হরমোনের পরিমান বাড়িয়ে দেয়। অ্যালকোহল ফাইব্রয়েডের প্রদাহকেও বাড়িয়ে দেয়। একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে যে যেসব মহিলারা দিনে একটি থেকে তিনটি বিয়ার খেয়ে থাকেন তাদের ফাইব্রয়েডের সমস্যা বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে ৫০% বেশি। অ্যালকোহল কমিয়ে বা বন্ধ করে দিলে ফাইব্রয়েডের ঝুঁকিও কমে যায়।

ইস্ট্রোজেন কে ব্যালান্সড রাখা

মহিলা এবং পুরুষ উভয়ের মধ্যেই সুস্থ স্বাভাবিক ফার্টিলিটির জন্য ইস্ট্রোজেন হরমোনের প্রয়োজন হয়, কিন্তু প্রয়োজনের অতিরিক্ত ইস্ট্রোজেন ফাইব্রয়েডের সংখ্যা বাড়িয়ে দেয় বা তা হওয়ার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়। ফাইব্রয়েডের সমস্যা সারানোর অনেক চিকিৎসাতেই ইস্ট্রোজেনের পরিমান কমানো হয়। এছাড়াও ইস্ট্রোজেন কে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারা যায় আরও যে যে পদ্ধতিতে, সেগুলো হল —

ফাইব্রয়েড কমানোর জন্য ডায়েট
  • ওজন কমানো — ফ্যাট সেল অতিরিক্ত ইস্ট্রোজেন তৈরি করে, ফলে ওবেসিটি বা শরীরের ওজন অতিরিক্ত বেড়ে গেলে ফাইব্রয়েডের সমস্যাও বেড়ে যায়, তাই ওজন কমালে ফাইব্রয়েডের গ্রোথও কমে যায়।
  • হরমোনের সমস্যা হতে পারে এমন কেমিক্যাল গ্রহণ না করা — প্রাকৃতিক এবং কৃত্রিম কেমিক্যাল এন্ডোক্রিন ব্যালান্সকে নস্ট করে দেয় ফলে ইস্ট্রোজেন হরমোনের পরিমান বেড়ে যায়। এই ধরনের কেমিক্যাল খাদ্য ও ত্বকের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে। যে যে বস্তুর কেমিক্যালের সংস্পর্শ এড়িয়ে যাওয়া উচিত তা হল —

সার, কীটনাশক, রান্নার নন–স্টিক বাসন পত্র, রঙ, কলপের রঙ, বিভিন্ন পার্সোনাল কেয়ার প্রোডাক্ট।

ব্লাড প্রেশার কম রাখা

সমীক্ষায় দেখা গেছে যে যেসব মহিলাদের ফাইব্রয়েডের সমস্যা আছে, তাদের হাউ ব্লাড প্রেশারের সমস্যাও আছে। যদিও এই ব্যাপারে এখনও অনেক সমীক্ষা করা বাকি আছে।

ব্লাড প্রেশার নিয়ন্ত্রণে রাখা যদিও সামগ্রিক শারীরিক সুস্থতার জন্য প্রয়োজন। এই পদ্ধতিগুলি অবলম্বন করতে পারেন —

  • খাদ্যে অতিরিক্ত নুন খাওয়া বন্ধ করতে হবে। তার বদলে বিভিন্ন মশলা ও হার্বস এর মাধ্যমে খাদ্যকে সুস্বাদু করা যেতে পারে।
  • হাই সোডিয়াম প্রসেসড এবং প্যাকেট জাত খাবার খাওয়া বন্ধ করতে হবে।
  • প্রতিদিন ব্লাড প্রেশার চেক করতে হবে
  • নিয়মিত এক্সারসাইজ করতে হবে
  • ওজন কমাতে হবে, বিশেষ করে কোমরের কাছের অতিরিক্ত মেদ কমাতে হবে
  • অ্যালকোহল বন্ধ করতে হবে
  • খাদ্যে পটাসিয়ামের পরিমান বাড়ানোর জন্য প্রতিবার খাদ্যে প্রচুর পরিমানে শাক সব্জি রাখতে হবে
  • ধূমপান বন্ধ করতে হবে এবং ধূমপায়ী ব্যক্তির কাছ থেকে দূরে থাকতে হবে (প্যাসিভ স্মোকিং থেকে দূরে থাকতে হবে)
  • হাই ব্লাড প্রেশার থাকলে নিয়মিত চেক আপ এবং ওষুধ খাওয়া চালু রাখতে হবে

যথেষ্ট পরিমানে ভিটামিন ডি গ্রহণ করতে হবে

ভিটামিন ডি প্রায় ৩২% পর্যন্ত ফাইব্রয়েডের সমস্যা কে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে। সূর্যের আলোর উপস্থিতিতে আমাদের শরীর নিজে থেকেই এই ভিটামিন তৈরি করতে পারে। ভিটামিন ডি সাপ্লিমেন্ট ছাড়াও আর যে যে খাবার শরীরে ভিটামিন ডি এর পরিমান বাড়াতে পারে, সেগুলো হল —

  • ডিমের কুসুম
  • দুধ, চীজ ও দুগ্ধজাত খাদ্য
  • ফর্টিফায়েড সিরিয়াল
  • সালমন  ও টুনার মতো তৈলাক্ত মাছ
  • কড লিভার অয়েল

ধূমপান এবং ডায়েটের সম্পর্ক

উজ্জ্বল রঙিন ও সবুজ শাক সব্জি শরীরের সামগ্রিক উন্নতির জন্য প্রয়োজন। লাল, হলুদ এবং কমলা রঙের সবজি শরীরে অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের পরিমান বাড়ায়। গাঢ় সবুজ রঙের শাক সব্জিও শরীরের নানা রকমের পুষ্টির প্রয়োজন যোগায়। এই ধরনের খাদ্য শরীর কে ক্যান্সার সহ অন্যান্য রোগ থেকেও রক্ষা করে।

ফাইব্রয়েড থাকলে যেসব খাদ্য খাওয়া উচিত নয়

যদিও একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে যে হলুদ ও কমলা রঙের খাদ্যে যে বিটা ক্যারোটিন পাওয়া যায়, তার সাথে ফাইব্রয়েডের উপশমের কোনো সম্পর্ক নেই। ধূমপায়ীদের ক্ষেত্রে বিটা ক্যারোটিন আরও বিপদ ডেকে আনে। একজন্য আরও সমীক্ষা করা প্রয়োজন। তবে ধূমপান বন্ধ শরীরের সামগ্রিক উন্নতি এবং ফাইব্রয়েডের সমস্যা কে দূরে রাখতে সাহায্য করে।

ফাইব্রয়েড বা জরায়ুর টিউমার থাকলে কি ধরনের খাবার খেতে হবে

খাদ্যাভ্যাস একা ফাইব্রয়েডের সমস্যা কে কমাতে পারে না। তবে ব্যালান্সড ডায়েট মেনটেন করলে ফাইব্রয়েডের রোগলক্ষনগুলো নিয়ন্ত্রণে থাকে—

  • ফাইবার — ফাইবার সমৃদ্ধ খাদ্য ওজন কমাতে এবং হরমোনের সমস্যা গুলি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। ব্লাড সুগার লেভেল কেও নিয়ন্ত্রনে রাখে ফাইবার সমৃদ্ধ খাদ্য। এইসব কারনে ফাইবার সমৃদ্ধ খাদ্য ফাইব্রয়েডের গ্রোথকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। যে খাদ্যগুলো খাওয়া যেতে পারে, সেগুলো হল — রান্না করা এবং কাঁচা শাক সব্জি, ফল, ওটস, মুসুর ডাল, বিন্স, বার্লি
  • পটাসিয়াম — পটাসিয়াম ব্লাড প্রেশার কে নিয়ন্ত্রন করতে সাহায্য করে। প্রতিদিনকার খাদ্যে এইসব পটাসিয়াম সমৃদ্ধ খাদ্য যোগ করতে হবে — অ্যাভোক্যাডো, কলা, লেবু জাতীয় ফল, খেজুর, মুসুর ডাল, ওটস, আলু, টম্যাটো
  • দুগ্ধজাত খাদ্য — দই, ফুল ফ্যাট চীজ ইত্যাদি দুগ্ধজাত দ্রব্য খাদ্য তালিকায় রাখতে হবে। এই ধরনের খাদ্য ক্যালসিয়াম, ফসফরাস এবং ম্যাগনেসিয়ামে সমৃদ্ধ। এই ধরনের খাদ্য ফাইব্রয়েডের গ্রোথকে নিয়ন্ত্রণে রাখে।
  • গ্রীন টি — গ্রীন টি তে প্রচুর পরিমানে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে। ফাইব্রয়েডের বিভিন্ন রোগ লক্ষনগুলি কে নিয়ন্ত্রন করা যায় এর মাধ্যমে।
ফাইব্রয়েড থাকলে যেসব খাদ্য খাওয়া উচিত নয়
  • সুগার  — মিস্টি জাতীয় খাদ্য এবং কার্বোহাইড্রেট ফাইব্রয়েডের রোগ লক্ষন কে অনেক গুনে বাড়িয়ে তোলে। এই ধরনের খাদ্য শরীরে ইনসুলিনের পরিমান বাড়িয়ে দেয়। অতিরিক্ত ইনসুলিন ওজনের বৃদ্ধি ঘটায় এবং এর ফলে ফাইব্রয়েডের সমস্যা বেড়ে যায়। রিফাইন্ড সুগার ও কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাদ্য যেমন – চিনি, গ্লুকোজ, মল্টোজ, কর্ন সিরাপ, সাদা রুটি, ভাত, পাস্তা, ময়দা, সোডা, সুগারি ড্রিংক, ফলের রিস, চিপস, প্যাকেজ এনার্জি বারস।
  • ইস্ট্রোজেন বেড়ে যায় এমন খাদ্য — কিছু খাদ্যে এমন কিছু প্রাকৃতিক উপাদান থাকে, যা  শরীরে ইস্ট্রোজেনের মতো কাজ করে। এদের ফাইটো ইস্ট্রোজেন বলা হয়। এর মধ্যে কিছু খাবার আছে, যেগুলো কম পরিমানে খেলে শরীরের উপকার হয়, কিন্তু বেশি পরিমানে খেলে শরীরের ওপর খারাপ প্রভাব বিস্তার করে । এই ধরনের খাবারের পরিমান কমিয়ে দিতে হবে, যেমন — সয়বীন, সয়মিল্ক, টফু, ফ্ল্যাক্স সিড।

সুষম খাদ্যাভ্যাস এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা শরীর কে সামগ্রিক ভাবে সুস্থ রাখে। যে সাবধানতাই নেওয়া হোক না কেন ফাইব্রয়েড হওয়া কে প্রতিরোধ করা যায় না তবে তার দ্রুত বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। শরীরে কোনো বদল হয়েছে মনে হলে তৎক্ষনাৎ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। আপনার যদি ফাইব্রয়েডের সমস্যা হয়ে থাকে তাহলে চিকিৎসকই সব থেকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন যে কি চিকিৎসা করা হবে। সুষম খাদ্যাভ্যাস এবং নিয়ন্ত্রিত জীবন ধারণ পদ্ধতি ফাইব্রয়েড সমস্যার সমাধানের প্রথম পদক্ষেপ।

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on telegram
Share on whatsapp
সাবস্ক্রাইব করুন

স্বাস্থ্য সম্পর্কিত বিভিন্ন খবর, তথ্য এবং চিকিৎসকের মতামত আপনার মেইল বক্সে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন.