হারপিস সিম্পলেক্স কী? এই রোগের কারণ, লক্ষণ, সতর্কতা, প্রতিকার ও চিকিৎসা

আজ আমরা আলোচনা করব হারপিস সিম্পলেক্স কী,কেন হয় এই রোগ এবং কিভাবে তার প্রতিকার করা সম্ভব।

ভাইরাসের প্রকোপ বারবার নানাভাবে বিদ্ধ করেছে ৷ এর করাল আঘাত বিভিন্নভাবে বিধ্বস্ত করেছে মানুষকে।তেমনই একটি ভাইরাস  হারপিস। যা মূলত দুই ধরণের — হারপিস সিম্পলেক্স এবং হারপিস জোস্টার। এদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী, সংক্রমণের ধরণও ভিন্ন। তবে হারপিস রোগের মূল কারণ হারপিস সিম্পলেক্স ভাইরাস।  

হারপিস সিমপ্লেক্স ভাইরাসও আবার দুই ধরনের হয়। যেমন — হারপিস সিমপ্লেক্স ভাইরাস 1 (HSV 1) এবং হারপিস সিমপ্লেক্স ভাইরাস 2 (HSV 2)। মুখে সংক্রমণ ঘটায় HSV-1, যেখানে যৌন সংসর্গের ফলে অর্থাৎ যৌনাঙ্গে যে সংক্রমণ ঘটে তার জন্য দায়ী HSV-2 ।  হারপিস সিম্পলেক্স ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হলে যে শারিরীক জটিলতার সূত্রপাত হয় তা একটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা, যার কোনও নিরাময় হয় না। বহু হারপিস আক্রান্ত ব্যক্তির মধ্যে কোনও উপসর্গ দেখা যায় না অথচ তাঁরা হারপিসের জীবাণু বহন করে চলেছেন। যদিও হারপিস নিরাময় হয় না, তবে ওষুধের সাহায্যে উপসর্গ গুলি থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। শিশুদের বা যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম আছে তাঁদের ক্ষেত্রে হারপিস নানারকম শারীরিক জটিলতার সৃষ্টি করতে পারে।

হারপিস সিম্পলেক্স কী?

হারপিস সিমপ্লেক্স একটি ভাইরাস ঘটিত রোগ যা নিবিড় শারীরিক যোগাযোগ এবং যে কোনও রকম শারীরিক সংস্পর্শ থেকে এক জনের থেকেই  অন্য জনের শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। প্রতি ৩ জন ব্যক্তির মধ্যে ১ জন এরকম হারপিসের জীবাণু বহন করেন। যারা এই ভাইরাসের জীবাণু বহন করেন তাঁদের মধ্যে ৮০% ব্যক্তি জানতে পারেন না যে তাঁরা হারপিসে আক্রান্ত কারণ। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তাঁদের মধ্যে হারপিস ভাইরাসের কোনোরকম উপসর্গ থাকেই না, এবং বহু সময় তা প্রকাশও পায় না।

তবে যাদের ক্ষেত্রে এই ভাইরাল সংক্রমণের উপসর্গ প্রকাশ পায়, তাদের সংক্রমণ স্থলে বিভিন্ন যন্ত্রণাদায়ক ক্ষত বা আলসারের সৃষ্টি হয়।

হারপিস সিম্পলেক্স ভাইরাস বা হারপিসে আক্রান্ত হওয়ার কারণ কী?

হারপিস সিম্পলেক্স ভাইরাসের কারণে হারপিসের যে সংক্রমণ ঘটে, তার কারণ জানতে হলে জানতে হবে কীভাবে এর সংক্রমণ ঘটে।

• মুখোমুখি চুম্বন বা শরীরের অন্যত্র চুম্বন থেকে লালারসের মাধ্যমে সংক্রমণ হতে পারে।

• সংক্রমিত কোনো ব্যক্তির ব্যবহৃত জিনিস অন্য জন ব্যবহার করলে সংক্রমিত হতে পারেন। যেমন লিপস্টিক, তোয়ালে, চিরুনি, ব্লেড পাউডারের ব্রাশ, ইত্যাদি।

• মায়ের যৌনাঙ্গে হারপিস থাকলে বাচ্চার জন্ম থেকেই হারপিস হবার সম্ভাবনা প্রবল থাকে।

তবে একটি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন, তা হলো হারপিসের ভাইরাস শরীরের ভেতরে একবার প্রবেশ করলে, তা আর শরীর থেকে যেতে চায় না। ত্বকের উপরিভাগে যে ক্ষত সৃষ্টি হয়, তা ঠিক হয়ে যায়, কিন্তু ভাইরাসটি নার্ভ-এর মধ্যে কোনো একটি কোষের মধ্যে থেকে যায় প্রায় সারা জীবন। তবে কোনো কোনো সময় দুশ্চিন্তা, মানসিক চাপ বা অবসাদ দীর্ঘ দিনের কোনও অসুখ, এছাড়াও জ্বর, দীর্ঘক্ষণ রোদের মধ্যে ঘোরাঘুরি, ঋতুচক্র, বা শরীরে কোনও অপারেশন হলে হঠাৎ করেই সেই ভাইরাস পুনরুজ্জীবিত হয়ে নার্ভ-এর কোষ থেকে বেরিয়ে ত্বকে পুনরায় ক্ষত সৃষ্টি করতে পারে ৷

হারপিসের লক্ষণ বা উপসর্গ গুলি কী কী?

• হারপিস হওয়ার আগে আক্রান্ত স্থানে জ্বালা ভাব এবং চুলকানি হয়। এটি সাধারণত মুখ, বুক বা পিঠের এক দিকে হতে পারে। মুখে হলে অনেক সময় মনে হয় সেই জায়গাটি কেটে যাচ্ছে এবং তার পরেই সেখানে জ্বরঠোসা হয়।

• প্রথমে জলভরা ছোট ফোসকার মতো দেখা দেয়। এই সময়টায় প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব হয়। তার দু-চার দিনের মধ্যে ফোসকাটি ফেটে গিয়ে সেখান থেকে ফ্লুইড বেরিয়ে আসে। এর পরে ফোসকার জায়গায় চামড়া উঠে যায়। এইরকম অবস্থা মোটামুটি দু-সপ্তাহ থাকে শুরুতে।

• মুখে হারপিস হলে জিভে, ঠোঁটে, গালেও তা হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

• যৌনাঙ্গের যে কোনও অংশে হতে পারে।

• মহিলাদের ক্ষেত্রে যৌনাঙ্গে সংক্রমণ হলে যোনির চারপাশে এবং নিতম্বের ফোসকা দেখা দেয়।

• পুরুষদের ক্ষেত্রে যৌনাঙ্গে সংক্রমণ হলে 

লিঙ্গ, অণ্ডকোষ এবং মলদ্বারের চারপাশে ফোসকা দেখা দিতে পারে।

• জ্বর এবং শরীরে হালকা থেকে তীব্র ব্যথার অনুভূতি হয়।

• হারপিসের এই সংক্রমণ চোখেও হতে পারে। সেক্ষেত্রে তখন আলোর সামনে যেতে অসুবিধে হয়। চোখ থেকে রস বেরতে থাকে। এইরকম অবস্থার সৃষ্টি হলে দ্রুত চিকিৎসা শুরু করতে হবে।

হারপিস রোগ কিভাবে নির্ণয় করা হয়?

ডাক্তাররা উপসর্গের ভিত্তিতে মূলত তিনটি পদ্ধতিতে হারপিসের সংক্রমণ নির্ণয় করেন।

রক্ত পরীক্ষা

রক্ত পরীক্ষা

শরীরে হারপিস সিম্পলেক্স ভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত করার জন্য রক্তের নমুনা সংগ্রহ হলে সংক্রমণ সনাক্তকরণের জন্য এইচএসভি অ্যান্টিবডিগুলির উপস্থিতি পরীক্ষা করা হয়।

পলিমারেজ চেইন রিঅ্যাকশন টেস্ট বা পিসিআর

এই পরীক্ষা পদ্ধতিতে রোগীর ক্ষত স্থান থেকে নমুনা নিয়ে ডিএনএ রেপ্লিকেশন টেস্ট করা হয়। এটি ভাইরাসের উপস্থিতি চিহ্নিত করার জন্য করা হয়।

ভাইরাস কালচার টেস্ট

এই পরীক্ষা পদ্ধতিতে ত্বকের টিস্যু থেকে একটি ছোট্ট অংশ বা হার্পিসের ফোসকাগুলির নমুনা নিয়ে ভাইরাস কালচার করা হয়।

হারপিসের প্রতিকার বা চিকিৎসা পদ্ধতি কী?

• হারপিসের এই ক্ষতগুলি সাধারণত স্বাভাবিক নিয়মে কয়েক দিন বাদে সেরে যায়। কিন্তু ব্যথার থেকে মুক্তি পেতে চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। তাড়াতাড়ি চিকিৎসা শুরু করলে অন্য জনের মধ্যে এই ভাইরাস সংক্রমণ ঘটবে না।

• যৌনাঙ্গে হারপিসের জন্য কিছু সাধারণ চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে। যেমন —

ফেমওয়্যার এবং জোভিরাক্স এর প্রয়োগ। এই  অ্যান্টিভাইরাল ড্রাগ গুলি সংক্রমণের প্রকোপ কমাতে ব্যবহৃত হয়।

• হারপিস আক্রান্ত রোগীকে যত্নে রাখা উচিত। বার বার ক্ষতস্থানে স্পর্শ করে প্রতিবার হাত ভালভাবে ধুয়ে ফেলতে হবে। আক্রান্ত স্থানটি শুকানোর জন্য আলাদা ভাবে যত্ন নেওয়া প্রয়োজন।

• যৌনাঙ্গে সংক্রমণ নিরাময় না হওয়া পর্যন্ত যৌন সংসর্গ করা উচিত নয়।

• প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে কিছু অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ অ্যান্টিবায়োটিক হিসেবে প্রয়োগ করা হয়। যেমন — অ্যাসিক্লোভির, ফ্যামিসিক্লোভির এবং ভ্যালাসিক্লোভির।

• মাঝে মাঝে আক্রান্ত স্থানে বরফ ঘষলে আরাম বোধ হয়। ঠান্ডা জলের সেঁকও ব্যথা থেকে মুক্তি দেয়।

হারপিস থেকে মুক্তি পেতে প্রয়োজন সতর্কতা

• যে কারণগুলির জন্য শরীরে থাকা প্রচ্ছন্ন ভাইরাসটি পুনরুজ্জীবিত হয়ে ওঠে, সেগুলিকে পরিত্যাগ করা। যেমন দুশ্চিন্তা, রোদে ঘোরাঘুরি, মানসিক চাপ ইত্যাদি।

• মুখে বা ঠোঁটে হারপিসের সংক্রমণ হলে, সতর্ক হয়ে চলুন যাতে আপনার থেকে অন্য জনের মধ্যে ভাইরাস ছড়িয়ে না পড়ে।

• হারপিস আক্রান্ত স্থানে ওষুধ লাগালে সঙ্গে সঙ্গে  হাত সাবান দিয়ে ধুয়ে ফেলুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *