কুষ্ঠ রোগের কারণ ও চিকিৎসা

কুষ্ঠ বা লেপ্রসি কি ?

কুষ্ঠ বা লেপ্রসি হল মাইকোব্যাকটেরিয়াম লেপরি নামক ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ থেকে সৃষ্ট ত্বক এবং স্নায়ুর একটি রোগ। গেরহার্ড হ্যানসেন নামে নরওয়ের এক চিকিৎসক ১৮৭৪ সালে কুষ্ঠরোগ নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা করার সময় এই ব্যাকটেরিয়ার খোঁজ পেয়েছিলেন। তাঁর নাম অনুসারে কুষ্ঠ রোগকে হ্যানসেন’স ডিজিজ বলেও অভিহিত করা হয়। এই রোগ হলে ত্বক, শ্লৈষ্মিক ঝিল্লি, পেরিফেরাল স্নায়ু, চোখ এবং শ্বাসযন্ত্র প্রভাবিত হয়। একথা অনস্বীকার্য যে কুষ্ঠ সম্পর্কে এখনো মানুষের মনে অনেক ভুল ধারণা আছে যার কারণ বিজ্ঞানমনস্কতার অভাব।

অন্য দিকে মাইকোব্যাকটেরিয়াম লেপরি এমন একটি ব্যাকটেরিয়া যার সংক্রমণ ঘটে ধীর গতিতে। তাই রোগ যথেষ্ট ছড়িয়ে না পড়লে অনেকেই বুঝতে পারেন না। সময় মতো চিকিৎসা করলে এই রোগ অবশ্যই নিরাময়যোগ্য। তবে আধুনিক চিকিৎসা পরিষেবা নিতে হবে। টোটকা বা হাতুড়ে চিকিৎসকের কাছে গেলে রোগ নিরাময় তো হবেই না বরং রোগী ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন (ডাব্লুএইচও)-এর বক্তব্য অনুযায়ী, কুষ্ঠ সম্ভবত শ্বাসযন্ত্রের মাধ্যমে এবং পোকামাকড়ের মাধ্যমে ছড়ায়।

কুষ্ঠ বা লেপ্রসি রোগের কারণ

কুষ্ঠরোগ মাইকোব্যাকটেরিয়াম লেপরি নামক ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের জেরে দেখা দেয়। এই ব্যাকটেরিয়া পরিবেশেই থাকে। মানুষের জিনগত পরিবর্তন কুষ্ঠরোগের আশঙ্কা বাড়িয়ে দেয়। অনুরূপভাবে দেহের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং প্রদাহের ফলে কুষ্ঠ হওয়ার আশঙ্কা বৃদ্ধি পায়। বহু দিন ধরে কুষ্ঠ রোগে ভুগছেন এমন কোনও ব্যক্তির সংস্পর্শ থেকেও এই রোগ হতে পারে। আবার নিশ্বাস নেওয়ার সময় নাসারন্ধ্রের মাধ্যমে শরীরে ব্যাকটেরিয়া ঢুকেও কুষ্ঠ সংক্রমণ হতে পারে।

কুষ্ঠ বা লেপ্রসি রোগের ধরণ

১. টিউবারকিউলয়েড লেপ্রসি- এই ধরণের কুষ্ঠ রোগের উপসর্গগুলি প্রচ্ছন্ন। ত্বকের মাত্র কয়েকটি জায়গায় ক্ষত বা sore হয়। এই পর্যায়ে জোরালো রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা থাকায় রোগ খুব বেশি ছড়াতে পারে না। এই ধরণের লেপ্রসির অন্য নাম পাউসিব্যাসিলারি কুষ্ঠ।

২. লেপ্রোমাটাস লেপ্রসি- কুষ্ঠ রোগের এই ধরণটিতে সমস্ত উপসর্গ তীব্র হয়ে ওঠে। রোগ ছড়িয়ে পড়ে। ত্বকের অনেক জায়গায় ক্ষত এবং লেসিয়ন দেখা দেয় যা স্নায়ু, ত্বক এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলিতে ছড়িয়ে পড়ে। এই ধরণের কুষ্ঠ হলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে। লেপ্রোমাটাস কুষ্ঠ টিউবারকিউলয়েড লেপ্রসির তুলনায় অনেক বেশি সংক্রামক। রোগের এই ধরণটিকে মাল্টিবেসিলারি কুষ্ঠ বলেও অভিহিত করা হয়।

৩. বর্ডারলাইন লেপ্রসি-  রোগের এই ধরণটিতে টিউবারকিউলয়েড এবং লেপ্রোমাটাস দুধরণের কুষ্ঠের উপসর্গই দেখা দেয়। বর্ডারলাইন লেপ্রসিকে ডাইমরফাস লেপ্রসিও বলা হয়।

স্কিন স্মীয়ার নামে একটি পরীক্ষার মাধ্যমে কুষ্ঠ রোগের ধরণ নির্ধারণ করা হয়। ত্বকের কুষ্ঠ আক্রান্ত অংশ থেকে সামান্য একটি অংশ কেটে নিয়ে এই টেস্ট করা হয়।

কুষ্ঠ বা লেপ্রসি রোগের লক্ষণ

মাল্টিবেসিলারি কুষ্ঠ হলে উপসর্গগুলি স্পষ্ট দেখা যায় যা এই রোগকে সহজে বুঝতে সাহায্য করে। এই ধরণের লেপ্রসির লক্ষণগুলি এরকম-

i.ফ্যাকাশে দাগ বা ছোপযুক্ত চামড়া।

ii.ত্বকের একেকটি অংশ অনুভূতিহীন ও বিবর্ণ হয়ে পড়ে। রোগাক্রান্ত অংশটি তার পাশের এলাকার তুলনায় হালকা রঙের হয়ে যায়।

iii.চামড়ার উপর ক্ষুদ্র ও উঁচু ফোঁড়া জাতীয় পদার্থ সৃষ্টি হয়।

iv.ত্বক শুষ্ক, খসখসে ও পুরু হয়ে ওঠে।

v.পায়ের পাতার নিচে ঘা হয়।

vi.মুখ বা কানের কিছু অংশ উঁচু হয়ে ফুলে যায়।

vii.চোখের পাতা ও ভুরু সম্পূর্ণ বা আংশিক নষ্ট হয়ে যায়।

viii.সংক্রামিত জায়গায় অসারভাব ও ঘাম হওয়া, পঙ্গুত্ব, পেশীতে দুর্বলতা, স্নায়ুর বৃদ্ধি, বিশেষত কনুই ও হাঁটুর চারপাশে এবং গলার দুধারে মুখের স্নায়ুতে রোগ ছড়িয়ে পড়লে অন্ধত্ব চলে আসে।

বাড়াবাড়ি পর্যায়ে আরো কিছু উপসর্গ লক্ষ্য করা যায়। সেগুলি এরকম-

i.পা ও হাত একদম অকেজো হয়ে যায়।

ii.আঙ্গুল ও পা ছোট হয়ে আসে এবং শুকিয়ে যায়।

iii.পায়ের আলসার বা ঘা নিরাময় হয় না।

iv.নাক বিকৃত হয়ে যায়।

v.চামড়ায় জ্বালা করে।

vi.স্নায়ুতে ব্যথা হয়।

কুষ্ঠ বা লেপ্রসি রোগ নির্ণয়

এমনিতে ত্বকের রঙে উল্লেখযোগ্য বদল দেখে অভিজ্ঞ ডাক্তারেরা এই রোগ নির্ণয় করতে পারেন। কুষ্ঠ সংক্রমণ হলে আক্রান্ত অংশের চামড়ার রং ত্বকের আসল রঙের চেয়ে গাঢ় বা হালকা হয়ে যায়। সাধারণত এই ছোপগুলি লালচে আভাযুক্ত হয়। লেপ্রসি হয়েছে নিশ্চিত করে বুঝতে ডাক্তার ত্বক বা নার্ভ বায়োপসির নিদান দিতে পারেন।

কুষ্ঠ বা লেপ্রসি রোগের চিকিৎসা

রাইফামপিন কুষ্ঠ রোগের সবচেয়ে ভালো ওষুধ। অ্যান্টিবায়োটিকের দ্বারা এই রোগের চিকিৎসা করা যাতে পারে। এক্ষেত্রে রোগের টাইপের ওপর নির্ভর করে একসঙ্গে একাধিক অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ দেওয়া হয়। একে বলে মাল্টি ড্রাগ থেরাপি (এমডিটি)। এর মধ্যে আছে ড্যাপসন, ক্লোফাজিমিন ও রিফাম্পিসিন। যদি এই সব ওষুধ থেকে রোগীর অ্যালার্জি হয় তাহলে বিকল্প হিসেবে মিনোসাইক্লিন, ক্ল্যারিথ্রোমাইসিন ও অফ্লক্সাসিন দেওয়া যেতে পারে।

পায়ের অসারভাব থেকে বাঁচতে বিশেষ ধরণের জুতো ব্যবহার করা যেতে পারে যা রোগীর পা-কে সুরক্ষিত রাখবে এবং স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে সাহায্য করবে। সার্জারির মাধ্যমে দেহের বাহ্যিক বিকৃতির চিকিৎসা করা যেতে পারে। এর ফলে রোগীর আত্মবিশ্বাসও ফিরে আসে।

এই রোগের চিকিৎসা করতে সব মিলিয়ে এক বছরের উপর সময় লেগে যায়। কুষ্ঠ হয়েছে বলে মনে হলে আতঙ্কিত না হয়ে দ্রুত ডাক্তারের কাছে যেতে হবে। যত দিন মানুষ এই রোগকে বুঝতে পারেনি তত দিন সমাজ কুষ্ঠরোগীদের এড়িয়ে যেত। আক্রান্ত রোগীকে আত্মীয়পরিজন থেকে সরিয়ে রেখে (কোয়ারানটাইন করে) চিকিৎসা করা হত। এখন কুষ্ঠরোগীদের বিচ্ছিন্ন করে রাখার দরকার হয় না। এই রোগকে ভয় পাওয়ার কোনও কারণ নেই। আমাদের মনে রাখতে হবে যে সময় মতো চিকিৎসা শুরু হলে কুষ্ঠ সম্পূর্ণ সেরে যায়।

সাবস্ক্রাইব করুন

স্বাস্থ্য সম্পর্কিত বিভিন্ন খবর, তথ্য এবং চিকিৎসকের মতামত আপনার মেইল বক্সে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন.