Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on telegram
Share on whatsapp

থাইরয়েড গ্রন্থির (Thyroid Gland) ভূমিকা কি? এই গ্রন্থি অস্বাভাবিক ক্ষরণে কি ধরনের সমস্যা হয়?

থাইরয়েড এমন একটি সমস্যা, যা সাধারণত প্রতিটি মানুষের শরীর অনুযায়ী ভিন্ন হয়৷ তবে থাইরয়েড গ্রন্থি সম্পর্কিত রোগ সম্বন্ধে বিশদে জানতে গেলে আগে তার কার্যকারিতা এবং সেই গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত হরমোন গুলির সম্বন্ধে জানা প্রয়োজন৷ আপনি ডাক্তারের পরামর্শ নিতে গেলে বা চিকিৎসার মধ্যে দিয়ে গেলে এই বিষয়টি আপনাকে অবশ্যই সাহায্য করবে৷ আপনি থাইরয়েড সম্পর্কিত রোগে আক্রান্ত হলে চিরাচরিত লক্ষণ গুলি ছাড়াও এমন কিছু লক্ষণ দেখা দিতে পারে, যা আপাত ভাবে আশ্চর্যজনক লাগে।

মানব শরীরে থাইরয়েড গ্রন্থির (Thyroid Gland) ভূমিকা কি? 

আমাদের গলার ভিতর অবস্থিত একটি ছোটো অঙ্গ থাইরয়েড গ্রন্থি। এটি মানবদেহের এন্ডোক্রাইন সিস্টেমের একটি অংশ। যেখান থেকে থাইরয়েড হরমোন ক্ষরিত হয় আর শরীরের হোমিওস্ট্যাটিস বজায় রাখার জন্য দায়ী এই থাইরয়েড গ্রন্থি। এর মধ্যে মূল দুটি হরমোন হলো ট্রাই আয়োডোথাইরোনিন( T3) এবং থাইরক্সিন( T4) ।

এই হরমোনগুলির মাত্রায় কোনওরকম অসামঞ্জস্যতার কারণে শরীরের নানাবিধ কার্যপ্রণালীতে ত্রুটি দেখা দিতে পারে। যেমন এনার্জি লেভেল, শরীরের অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা, চুল, ত্বক, ওজন ইত্যাদি। থাইরয়েড রোগ খুবই সাধারণ ব্যাপার এবং পুরুষদের তুলনায় মহিলারাই বেশি আক্রান্ত হন। থাইরয়েডের প্রধান দুটি সমস্যা হল – হাইপারথাইরয়েডিজম এবং হাইপোথাইরয়েডিজম। হাইপারথাইরয়েডিজম অত্যধিক মাত্রায় থাইরয়েড হরমোনের উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত, অন্যদিকে এই হরমোনের মাত্রাল্পতাকে হাইপোথাইরইয়েডিজম বলে। থাইরয়েড ক্যান্সার থাইরয়েড গ্রন্থির আরেকটি গভীর সমস্যা এবং পৃথিবীতে সবচেয়ে সাধারণ এন্ডোক্রাইন ক্যান্সার। এর অন্তর্নিহিত কারণগুলি স্পষ্ট এবং রোগ নির্ণায়ক পরীক্ষার মাধ্যমে চিহ্নিত করা যেতে পারে। দ্রুত চিকিৎসা থাইরয়েড গ্রন্থির স্বাভাবিক কার্যকলাপ পুনরুদ্ধারে সহায়ক হতে পারে। জীবনশৈলীর সুব্যবস্থাপণার মধ্যে রয়েছে পর্যাপ্ত পরিমাণে আয়োডিন সমৃদ্ধ সুষম খাদ্যগ্রহণ এবং মানসিক চাপের মোকাবিলায় ধ্যান ও যোগব্যায়ামের অনুশীলন। এর সঙ্গে নিয়মিত চেকআপ এবং এন্ডোক্রাইনোলজিস্টের কাছে পরামর্শ নেওয়া থাইরয়েডের সমস্যার নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে।

T3 এবং T4 হরমোনের কার্যকারিতা তাহলে কি? শারীরবৃত্তীয় কার্যকলাপে এর ভূমিকাই বা কি?

থাইরয়েড একটি গ্রন্থি যা আমাদের গলায় শ্বাসনালির সামনের দিকে অবস্থিত। এই গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত হরমোন মানুষের শরীরের বিভিন্ন কাজ নিয়ন্ত্রণ করে। এটি মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাস এবং পিটুইটারি গ্রন্থির সাথে যুক্ত থাকে এবং আকৃতি ও আয়তনে একটি মটরশুঁটির ন্যায় হয়। হাইপোথ্যালামাস থাইরোট্রপিন-রিলিজিং হরমোনের ক্ষরণ করলে, পিটুইটারি গ্রন্থি থাইরয়েড স্টিমুলেটিং হরমোন (TSH) ক্ষরণের সূচনা করে। এই TSH হরমোন থাইরয়েড গ্রন্থিকে T3 এবং T4 হরমোন নিঃসরণ করতে সাহায্য করে। অর্থাৎ TSH হরমোন ছাড়া এই পুরো প্রক্রিয়া টাই ভিত্তিহীন৷
থাইরক্সিন (T4) হরমোনটি দেহের মেটাবলিজম, মানসিক অবস্থা, শরীরের তাপমাত্রা ইত্যাদির জন্য দায়ী। T3 হরমোন যা সাধারণত থাইরয়েড গ্রন্থি থেকে উৎপন্ন হয়, সেটি T4 থেকে T3 তে রূপান্তরিত হয়ে শরীরের ভিতর অন্য টিস্যু বা কলাতে তৈরি হতে পারে। এই পদ্ধতিকে বলে ডিআয়োডিনেশন
যদি শরীরের অভ্যন্তরীণ শারীরবৃত্তীয় কার্যকলাপ সঠিক থাকে, তাহলে শরীরে T3 এবং T4 হরমোনের নিঃসরণ কম হলে, পিটুইটারি গ্ল্যান্ড থেকে TSH হরমোনের নিঃসরণ বেশি হয়, আবার T3, T4 এর নিঃসরণ বেশি হলে TSH এর নিঃসরণ কম হয়।

T3 অথবা T4 এর আধিক্য শরীরে বেশি হলে কি সমস্যা দেখা দিতে পারে?

  • অ্যাংজাইটি
  • শারীরিক অস্বস্তি
  • হাইপারঅ্যাক্টিভিটি
  • চুল পড়ে যাওয়া
  • অনিয়মিত মাসিক
  • অতিরিক্ত ঘাম হওয়া
  • শরীরে কম্পন এবং কাঁপুনি

এছাড়াও T3 হরমোনের অতিরিক্ত ক্ষরণ থাইরোটক্সিকোসিস রোগের সৃষ্টি করে। যা সাধারণত হাইপারথাইরয়েডিসম থেকে সৃষ্ট।

T3 এবং T4 এর ক্ষরণ কম হলে কি ধরনের সমস্যা দেখা দেয় ?

এই হরমোন গুলির ক্ষরণ কম হলেও কিছু সমস্যা দেখা দেয়, যেমন

obesity due to hypothyroidism
  • ওজন বৃদ্ধি
  • স্মৃতিভ্রংশ
  • গায়ে হাত পায়ে যন্ত্রণা
  • আলস্য
  • কন্সটিপেশন
  • ত্বকের শুষ্কতা
  • স্মৃতিশক্তি হ্রাস।
তাহলে থাইরয়েড স্টিমুলেটিং হরমোন (TSH) এর ভূমিকা কি?

থাইরয়েড গ্রন্থির কার্যকারিতা পিটুইটারি গ্রন্থির সাথে তার সম্পর্কের মাধ্যমে কিছু অংশ নির্ধারিত হয়। মস্তিষ্কের আন্ডারসাইডে বা পশ্চাদ অংশে অবস্থিত হাইপোথ্যালামাসের সাথে সংযুক্ত এই “মাস্টার গ্রন্থি” থাইরয়েড সহ বেশ কয়েকটি গ্রন্থির কাজ নিয়ন্ত্রণ করে।
এই TSH হরমোনটি পিটুইটারি গ্রন্থি দ্বারা নিঃসৃত হয়। আপনার পিটুইটারি অনুভব করে যে আপনার রক্তচাপের পর্যাপ্ত থাইরয়েড হরমোন আছে কিনা, এবং যখন এটি অপর্যাপ্ত মাত্রা সনাক্ত করে, আপনার পিটুইটারি রিলিজটি আপনার থাইরয়েডকে আরও থাইরয়েড হরমোন নির্গমন করতে অনুপ্রাণিত করে। আপনার থাইরয়েড নিষ্ক্রিয় হওয়ার কারণেই আপনার টিএসএইচ বেড়ে যায় । একটি উচ্চ TSH এর মানে হল যে পিটুইটারি গ্রন্থিটি তার থাইরয়েড হরমোন উৎপাদনে প্রতিক্রিয়া করার চেষ্টা করার জন্য তার হরমোনটি মুক্তি করছে।
উলটো দিকে, যখন আপনার পিটুইটারি গ্রন্থির অনুভূতি হয় যে অত্যধিক থাইরয়েড হরমোনের সঞ্চালন হচ্ছে, তখন এটি ধীরে ধীরে TSH মুক্ত করে দেয়। TSH কমানোর মানে হল যে আপনার থাইরয়েড হরমোনের মুক্তির জন্য কোন বার্তা পাচ্ছে না এবং তাতে থাইরয়েড হরমোনের উৎপাদন হ্রাস পাবে।
একটি বিষয় মনে রাখা খুব জরুরি যে, গর্ভাবস্থায় এই হরমোনগুলির সঠিক মাত্রা বজায় রাখা একান্ত প্রয়োজন। কারণ, থাইরয়েড স্টিমুলেটিং হরমোন একটি সুস্থ ভ্রুণের বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

সেক্ষেত্রে মানবদেহে এই হরমোন গুলির নির্দিষ্ট মাত্রা কি? কিভাবে বুঝবো যে আমি থাইরয়েড জনিত রোগে আক্রান্ত কি না!

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের থাইরয়েড অ্যাসোশিয়েশনের মতে সবক্ষেত্রে পরীক্ষার প্রয়োজন হয় না। তবে অন্যান্য হরমোনের স্বাভাবিক মাত্রা বজায় না থাকলে ডাক্তার রা TSH লেভেল রক্ত পরীক্ষা করাতে পরামর্শ দেন৷
TSH পরীক্ষার জন্য আনুমানিক রেফারেন্স রেঞ্জ 0.5 থেকে 4.5 বা 5.0 (এমআইইউ / এল) অব্ধি হয়। একটি রোগীর যার TSH স্তরের রেফারেন্স রেঞ্জের মধ্যে “ইথাইটিয়ার্ড” হিসাবে বলা হয় এবং স্বাভাবিক থাইরয়েড ফাংশন বলে মনে করা হয়। তবে মতান্তরে কিছু বিশিষ্ট এন্ডোক্রাইনোলজিস্টরা মনে করেন এই হরমোনের সর্বোচ্চ স্বাভাবিক মাত্রা কমিয়ে 2.5 করা উচিত। অর্থাৎ রেফারেন্স রেঞ্জ হবে 0.5-2.5 (এম আই ইউ/এল)। এই রেফারেন্স পরিসীমাকেই “স্বাভাবিক পরিসীমা” বলা হয়।
সাধারণত রক্তে TSH এর মাত্রাই নির্ধারণ করে পুরো প্রক্রিয়া টা সঠিক ভাবে কাজ করছে কিনা। কিন্তু থাইরয়েড নির্ণয়ের জন্য এর সাথে পরীক্ষা করা হয় T3 এবং T4 এর মাত্রাও। T3 হরমোনের স্বাভাবিক মাত্রা হলো 100 থেকে 200 ন্যানোগ্রাম/ডেসিলিটার (ng/dl) যেখানে T4 এর রেফারেন্স রেঞ্জ হলো 5.0-12.0 মাইক্রোগ্রাম / ডেসিলিটার। শরীরে উপস্থিত মুক্ত T4 এর ক্ষেত্রে স্বাভাবিক মাত্রা হলো 0.8-1.8 ন্যানোগ্রাম / ডেসিলিটার।
যদিও এটি মনে রাখা প্রয়োজন যে, বিভিন্ন ল্যাবরেটরি এবং ডাক্তারদের ক্ষেত্রে রেফারেন্স রেঞ্জ এর সামান্য তারতম্য থাকতেই পারে। একটি ল্যাবরেটরিতে হওয়া পরীক্ষার ফল যে নিশ্চিত ভাবে সঠিক হবে এমনটা বলা যায় না৷ সেক্ষেত্রে নিজের সুবিধার্থে আপনি একাধিক ল্যাবরেটরি থেকে পরীক্ষা করাতে পারেন৷ এছাড়াও থাইরয়েড আল্ট্রাসাউন্ড অথবা বায়পসি পরীক্ষার দ্বারা সঠিক ভাবে আপনার লক্ষণ গুলির কারণ এবং হরমোনের স্বাভাবিক মাত্রা না থাকার কারণ নির্ণয় করা যায়। পরীক্ষ গুলি করানোর পর অবশ্যই কোনো এন্ডোক্রাইনোলজিস্টের পরামর্শ নিন, তিনি ফলাফলের ভিত্তিতে আপনার সমস্যার সঠিক অবস্থান সম্পর্কে আপনাকে অবগত করতে পারবেন।

থাইরয়েডের সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে প্রাথমিক বিষয় যেগুলি মেনে চলা উচিত সেগুলো কি?

ওষুধ ছাড়াও হরমোনাল ইমব্যালেন্সের মতো সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে জীবনযাত্রায় কিছু পরিবর্তন আনা অবশ্যই দরকার। থাইরয়েড জনিত সমস্যা থেকেও রেহাই মিলবে এইগুলি মেনে চললে। ডাক্তারের পরামর্শে ওষুধ চললেও মেনে চলুন এই বিষয় গুলো :

স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট

অতিরিক্ত স্ট্রেস যে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রোগের জন্ম দেয় তা আমাদের সকলেরই জানা। অতিরিক্ত স্ট্রেস, ফেটিগের মতো সমস্যাকে বাড়িয়ে দেয়। প্রভাবিত করে T3 এবং T4 হরমোনের স্বাভাবিক ক্ষরণকেও। তাই থাইরয়েড জনিত সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট যে নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। স্ট্রেস থেকে মুক্তি পেতে ভরসা থাকুক যোগাভ্যাস এবং মেডিটেশনে।

স্বাস্থ্যকর খাদ্য

Healthy Food

যেহেতু থাইরয়েড রোগীদের আয়োডিনের অভাবজনিত কারণে হয়ে থাকে সেই জন্য আয়োডিনযুক্ত খাবার গুলি অতিরিক্ত পরিমাণে আপনাকে খেতে হবে। যেমন গাজর দুধ সামুদ্রিক মাছ শাকসবজি এবং মৌসুমি ফল গুলিতেও প্রচুর পরিমাণে আয়রন থাকে।
থাইরয়েড কে নিয়ন্ত্রণ করতে হলে প্রোটিনের মাত্রা খুব বেশি থাকা দরকার সেই জন্য আপনার পাতে নিয়মিত মুরগির মাংস ডিম পনির ইত্যাদি খেলে থাইরয়েড সমস্যা নিয়ন্ত্রণে আনা যায়।
প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টি অক্সিডেন্ট এবং ভিটামিন বি১২ সমৃদ্ধ খাবার নিয়মিত রাখতে হবে ডায়েটে। এছাড়াও ডায়েটে থাক প্রোবায়োটিকস এবং ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড সমৃদ্ধ খাবার।
চিনি বর্জন করুন, এছাড়াও বাদ দিতে হবে যেকোনো প্রকার প্রসেসড খাবার।

শরীর চর্চা

Exercise

যোগ ব্যায়াম বা সাধারণ ফ্রি হ্যান্ড এক্সারসাইজ করুন নিয়মিত। দিনে মোটামুটি ২০-৩০ মিনিটের এই৷ শরীর চর্চা রাখুন রোজকার রুটিনে৷ এর ফলে গ্রন্থি থেকে হরমোন নিঃসরণের স্বাভাবিক মাত্রা বজায় থাকবে। মিলবে মানসিজ চাপ থেকে মুক্তি। হরমোনাল ইমব্যালেন্সের মত সমস্যা থেকেও মিলবে মুক্তি৷

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on telegram
Share on whatsapp
সাবস্ক্রাইব করুন

স্বাস্থ্য সম্পর্কিত বিভিন্ন খবর, তথ্য এবং চিকিৎসকের মতামত আপনার মেইল বক্সে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন.