ভালভার ক্যান্সার কি এবং এর কারণ ও চিকিৎসা

প্রথমে দেখে নেওয়া যাক, ভালভার ক্যান্সার বলতে ঠিক কি বোঝায়। লাবিয়া মেজোরা বা যোনির উপরের পুরু ঠোঁটের মতো আবরণ সাধারণত সবচেয়ে বেশি ভালভার ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে, ভালভার ক্যান্সার স্কোয়ামাস সেল প্রকারের হয় এবং এই ধরণ অনুযায়ী পরবর্তী পর্যায়ে একে কেরাটিনাইজিং, ব্যাসালয়েড, এবং ভেরুকাস হিসেবে শ্রেণিবিভাগ করা যায়।

ভালভা হল মূত্রনালী (যে অংশ থেকে প্রস্রাব বের হয়) এবং যোনি (লিঙ্গ, মাসিক এবং প্রসবের জন্য পেশীবহুল নির্গমন পথ) এর চারপাশের ত্বকের একটি এলাকা। ভ্যাজাইনাল বা ভালভার ক্যান্সার সাধারণত ভালভাতে ক্ষত সৃষ্টি করে যার ফলে ভীষণ চুলকানি হয়।

এখানে উল্লেখ্য, যে কোন বয়সে এই ক্যান্সার হতে পারে কিন্তু বয়স্কদের ক্ষেত্রে বেশি দেখা যায়। সাধারণত ভালভার ক্যান্সার ধীরে ধীরে এগোয়। এই ক্যান্সারের প্রথম পর্যায়ে ভালভার চার দিকের চামড়ার সুস্থ কোষগুলিতে অস্বাভাবিক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। চিকিৎসা শুরু না হলে এই কোষগুলোতে অবিলম্বে ক্যান্সারের প্রকোপ দেখা দেয়।

ভালভার ক্যান্সারের উপসর্গ

ভালভার ক্যান্সারের প্রাথমিক স্তরে কোনও উপসর্গ দেখা নাও দিতে পারে। উপসর্গ দেখা দিতে শুরু করলে সেগুলো এরকম:

. অস্বাভাবিক রক্তপাত ।

. ভালভার অঞ্চলে চুলকুনি ।

. চামড়ার একটা অংশ বিবর্ণ হয়ে যাওয়া ।

. প্রস্রাবের সময় ব্যথা ।

. ভালভার অঞ্চলে ব্যথা এবং এলাকাটি খসে পড়া ।

. ভালভাতে মাংসপিণ্ড সৃষ্টি অথবা আঁচিলের মতো একাধিক প্রদাহ ।

ভালভার ক্যান্সার হয়েছে বলে সন্দেহ হলে অবিলম্বে ডাক্তারের কাছে যেতে হবে। তাড়াতাড়ি রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসা শুরু হলে ক্যান্সার ছড়াতে পারবে না।

ভালভার ক্যান্সারের কারণ

স্পষ্ট কারণ জানা না গেলেও কাদের ভালভার ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি বেশি তা বলা যায়। নিম্নলিখিত ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেশি:

. যে সব মেয়ের পঞ্চান্নর বেশি বয়স ।

. নিয়মিত ধূমপান করলে ।

. ভালভার ইনট্রাপিথেলিয়াল নিওপ্লাসিয়া থাকলে ।

. এইচ ই ভি অথবা এইডস থাকলে ।

. প্যাপিলোমা ভাইরাসের সংক্রমণ ঘটলে ।

. যৌনাঙ্গে আঁচিল অথবা জরুল থাকলে ।

. ভালভায় ছড়িয়ে পড়া লিচেন প্ল্যানাস এর মতো চামড়ার সমস্যা থাকলে ।

রোগনির্ণয়

প্রথমে ডাক্তার আপনাকে পরীক্ষা করবেন। ভালভাটিকে নিরীক্ষণ করবেন। এই রোগে আক্রান্ত  হওয়ার আগে আপনার কি ধরণের রোগব্যাধি হয়েছে তাও জানতে চাইবেন। আপনার লাইফস্টাইল সম্পর্কেও প্রশ্ন করবেন। তারপরে আপনার বায়োপসি করা হবে। ব্যথা রোধ করতে অ্যানাসথেসিয়ার মাধ্যমে ভালভা অবশ করে চামড়া থেকে সামান্য একটু কেটে নিয়ে বায়োপসি করতে পাঠানো হবে। বায়োপসিতে ভালভার ক্যান্সার নিশ্চিত জানা গেলে রোগিকে গাইনোকোলজিক অনকোলজিস্ট-এর কাছে পাঠানো হতে পারে। তিনি আপনার বায়োপসি রিপোর্ট ভালো করে পড়ে ও আরো কয়েকটি পরীক্ষা করে জেনে নেবেন ক্যান্সার কোন পর্যায়ে আছে।

ভালভার ক্যান্সারের বিভিন্ন পর্যায়

রোগ কোন পর্যায়ে রয়েছে জানলে ডাক্তার বুঝতে পারবেন ক্যান্সার কতটা মারাত্মক হয়ে উঠেছে। ভালভার ক্যান্সারের পর্যায়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চিকিৎসার পদ্ধতি সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেবেন তিনি। রোগের পর্যায় নির্ধারণ করার সময় প্রাথমিকভাবে টিউমারের অবস্থান, কাছাকাছি লিম্ফ নোডগুলিতে ক্যান্সারের বিস্তার এবং টিউমারগুলির আকার ও সংখ্যা মাথায় রাখা হয়। ভালভার ক্যান্সারের চারটি পর্যায়। এই চারটি পর্যায়কে শুন্য থেকে চার পর্যন্ত ধরা হয়। পর্যায় যত উঁচুতে ওঠে তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ক্যান্সারের তীব্রতাও বাড়ে। 

রোগটির একেবারে গোড়ার দিকের পর্যায়কে স্টেজ জিরো বা শুন্য পর্যায় বলে অভিহিত করা হয়। এই পর্যায়ে ভালভার চামড়ার উপরিভাগে কর্কটরোগ সীমাবদ্ধ থাকে।

প্রথম পর্যায়ে শুধু ভালভা অথবা পেরিনিয়াম ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়। ভ্যাজাইনার মুখ এবং মলদ্বারের মধ্যেকার চামড়ার অংশটিকে পেরিনিয়াম বলে। এই পর্যায়ে লিম্ফ নোড বা দেহের অন্য অংশ পর্যন্ত টিউমার ছড়িয়ে পড়ে না।

দ্বিতীয় পর্যায়ে রোগ ভালভা থেকে কাছাকাছি এলাকা যেমন ইউরেথ্রা, ভ্যাজাইনা এবং মলদ্বার বা অ্যানাসের নিচের দিক পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে।

তৃতীয় পর্যায়ে ভালভার ক্যান্সার কাছাকাছি লিম্ফ নোডগুলিতে ছড়িয়ে পড়ে।

চতুর্থ এ (4A) পর্যায়ে ক্যান্সার আরো বেশি করে লিম্ফ নোড অথবা ইউরেথ্রা ও ভ্যাজাইনার ওপরের অংশ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। কোনও কোনও ক্ষেত্রে ব্লাডার, নিতম্ব বা পেলভিক বোন পর্যন্তও ছড়িয়ে পড়ে।

চতুর্থ বি(4B)পর্যায়ে ক্যান্সার দূরবর্তী অঙ্গসমূহ বা লিম্ফ নোডগুলিতে ছড়িয়ে পড়ে।

ভালভার ক্যান্সারের পর্যায় স্থির করার পদ্ধতি

*জেনাটেল বা লোকাল অ্যানাসথেসিয়া করে।

*পেলভিক এলাকায় পর্যবেক্ষণ চালিয়ে।

*জায়গাটিতে ক্যান্সারের বিস্তার সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।

*গ্রয়েন এরিয়াতে বড় লিম্ফ নোডগুলিকে চিহ্নিত করতে সি টি স্ক্যান করা হয়।

*এম আর আই স্ক্যান করে চিকিৎসক বুঝতে পারেন পেলভিক টিউমার মাথা কিম্বা মেরুদন্ড পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছে কিনা। সিস্টোস্কোপি এবং প্রোক্টোস্কোপি করে ডাক্তার বুঝতে পারেন ক্যান্সার ব্লাডার এবং পায়ু অবধি ছড়িয়ে পড়েছে কিনা। 

চিকিৎসা 

রোগ কোন পর্যায়ে রয়েছে তার ওপর ভিত্তি করে ভালভার ক্যান্সারের চিকিৎসা করা হয়। সাধারণত চারটি পদ্ধতিতে চিকিৎসা করা হয়। এগুলি হল-

লেসার থেরাপি :- তীব্র লেসার রশ্মির সাহায্যে ভালভার ক্যান্সার আক্রান্ত কোষগুলিকে মেরে ফেলা হয়। এন্ডোস্কোপ নামের একটি সরু টিউবের সাহায্যে টিউমারগুলিকে চিহ্নিত ও ধ্বংস করা হয়। রোগিকে হাসপাতালে ভর্তি না করেই বহির্বিভাগে লেসার রশ্মির প্রয়োগ করা যায়। রোগি সে দিনই বাড়ী ফিরে যেতে পারেন।

সার্জারি :- সার্জারি বা অস্ত্রোপচার ভালভার ক্যান্সার সারাতে বহুল ব্যবহৃত পদ্ধতি। বিভিন্ন ধরণের সার্জারির মাধ্যমে রোগ নির্মূল করে ফেলার চেষ্টা হয়। ক্যান্সার কোন পর্যায়ে রয়েছে এবং রোগির সামগ্রিক স্বাস্থ্যের ওপর নির্ভর করে সার্জারির ধরণ নির্ভর করে।

লোকাল একসিশন  :- ক্যান্সার বেশি দূরে বা লিম্ফ নোডগুলিতে ছড়িয়ে না পড়লে এই পদ্ধতির সাহায্য নেওয়া হয়। এই পদ্ধতিতে ভালভার ক্যান্সার আক্রান্ত অংশটি এবং তার আশেপাশের সামান্য কিছু স্বাভাবিক কোষ বার করে নেওয়া হয়। দরকার মনে করলে কয়েকটি লিম্ফনোডও উপড়ে ফেলা হয়।

ভালভেকটোমি :- ভালভেকটোমি এক ধরণের সার্জারি। ক্যান্সার কতটা ছড়িয়েছে তার ওপর নির্ভর করে সম্পূর্ণ বা আংশিক ভালভেকটমি সার্জারির মাধ্যমে ভালভার পুরো বা খানিকটা অংশ বাদ দেওয়া হয়। 

এছাড়া পেলভিক একজেনটেরাশন, রেডিয়েশন থেরাপি এবং কেমোথেরাপি প্রয়োগ করা যেতে পারে। ভালভার ক্যান্সার অনেকটা ছড়িয়ে পড়লে এই ভাবে সার্জারি করা হয়।

ক্যান্সার কোন জায়গায় ছড়িয়েছে দেখে নিয়ে সার্জন দরকার মতো সার্ভিক্স, ভ্যাজাইনা, লোয়ার কোলোন, পায়ু, ব্লাডার, ভালভা, ওভারি বা ডিম্বাশয় এবং লিম্ফ নোড বাদ দিয়ে দেন। ব্লাডার, পায়ু ও কোলন বাদ দেওয়া হলে সার্জন স্টোমাসো নামে একটি উন্মুক্ত পথ সৃষ্টি করে দেবেন যার সাহায্যে বিষ্ঠা ও প্রস্রাব দেহ থেকে বেরিয়ে যেতে পারে।

ভালভার টিউমারগুলিকে ছোটো করে দেওয়া এবং ক্যান্সার কোষগুলিকে ধ্বংস করার জন্য রেডিয়েশন থেরাপির আশ্রয় নেওয়া হয়। এই পদ্ধতিতে উচ্চ শক্তির তেজস্ক্রিয় রশ্মি ভালভার আক্রান্ত অংশে প্রবেশ করিয়ে ক্যান্সারে ক্ষতিগ্রস্ত কোষগুলিকে নির্মূল করে দেওয়া হয়। রোগির দেহের বাইরে থেকে যন্ত্রের সাহায্যে তেজস্ক্রিয় রশ্মি ঢুকিয়ে এই থেরাপি করা যায়। তবে কিছু ক্ষেত্রে দেহের ভেতরে রেডিয়েশন সিড অথবা ওয়ার ঢুকিয়েও এই থেরাপি করা হয়।

কেমোথেরাপি

ভালভার ক্যান্সারের চূড়ান্ত পর্যায়ে বা ক্যান্সার অন্যান্য অঙ্গে ছড়িয়ে পড়লে এই পদ্ধতির সাহায্য নেওয়া হয়। এই পদ্ধতিতে একাধিক রাসায়নিক ওষুধ প্রয়োগ করা হয়। কেমোথেরাপি ক্যান্সারের গতিরোধ করে। তাছাড়া এই থেরাপিতে কর্কট রোগে আক্রান্ত কোষগুলির বৃদ্ধি হয় না। মুখ দিয়ে, শিরার মাধ্যমে (IV) এবং টপিকাল ক্রিম ব্যবহার করে কেমোথেরাপি করা যেতে পারে।

মনে রাখতে হবে,আরোগ্যলাভ এবং ভালভার ক্যান্সারের চিকিৎসা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরেও রোগিকে মাঝেমাঝে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের কাছে যেতে হবে। রোগ সম্পূর্ণ সেরে গেছে কিনা বা আরোগ্যের পরেও ফিরে আসছে কিনা তা জানতে এটা জরুরি। সেই সঙ্গে ডাক্তারের কাছে গেলে তবেই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ব্যাপারটাও বোঝা যাবে।

সাবস্ক্রাইব করুন

স্বাস্থ্য সম্পর্কিত বিভিন্ন খবর, তথ্য এবং চিকিৎসকের মতামত আপনার মেইল বক্সে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন.