Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on telegram
Share on whatsapp

বয়ঃসন্ধিকালে মানসিক পরিবর্তন স্বাভাবিক, এই সময় সন্তানের মনের যত্ন নিন

দ্বিধাহীন ভাবেই একটি ছেলে বা মেয়ের বেড়ে ওঠার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো বয়ঃসন্ধিকাল৷ আগল ভাঙার এই বয়সে তারা শৈশব থেকে কৈশোরে পদার্পণ করে। যৌন হরমোনের ক্ষরণে শরীর ও মনে আসে একটি বিরাট পরিবর্তন। এমন এক বয়স, যখন ভাবনা আসে, ‘কেউই আমাকে বোঝে না’। অন্যের মনোযোগ পাওয়ার বাসনা , বিপরীত লিঙ্গের প্রতি কামনা জন্মায় এই বয়ঃসন্ধির সময়। আবার এই বয়সেই থাকে ভুল পথে যাওয়ার আশঙ্কাও, আচমকা মতিভ্রম টেনে নিয়ে যায় বিপদের মুখে। বাবা-মা, অভিভাবকদের কাছেও তাই এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ সময়। তাঁদের দায়িত্ব থাকে সন্তানের বয়ঃসন্ধিতে সত্যিকারের পাশে থাকার।

বয়ঃসন্ধিকালে মানসিক পরিবর্তন

সন্তানকে তাদের মতো করে বোঝার চেষ্টা করা, পাশে থাকার এবং সর্বোপরি বন্ধুর মতো মিশে তাঁদের সমস্যা সমাধান করার দায়িত্ব বর্তায় আসলে বাবা-মায়ের উপরেই। আসলে সবার জীবনেই বয়ঃসন্ধি নামক এই ক্রান্তিকালকে অতিক্রম করতে প্রয়োজন হয় বন্ধুর। আর এই জায়গাটা পূরণ করতে হবে বাবা-মাকেই। নির্ভরযোগ্য এবং ভরসাযোগ্য বন্ধু তারা কিভাবে হয়ে উঠবেন সন্তানের, সে সিদ্ধান্ত কিন্তু তাদেরই নিতে হবে৷

বয়ঃসন্ধি আসলে কি, কেনই বা আসে এই পরিবর্তন?

বয়ঃসন্ধি বা Puberty একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে একটি শিশুর শরীর ধীরে ধীরে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের শরীরে রূপান্তরিত হয় এবং প্রজনন ক্ষমতা লাভ করে৷ মস্তিষ্ক থেকে গোনাডে হরমোন সংকেত যাবার মাধ্যমে এর সূচনা ঘটে। দেশ, সংস্কৃতি, পরিবেশ, স্বাস্থ্য, খাদ্যাভ্যাস এবং জীবনযাপনের ওপর নির্ভর করে বয়ঃসন্ধির সময়কাল। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা-র মতে, ১০ থেকে ১৯ বছর বয়স পর্যন্ত ছেলে বা মেয়েকে কিশোর বা কিশোরী বলে অভিহিত করা হয়। এর যে কোনও সময় শুরু হতে পারে বয়ঃসন্ধি প্রক্রিয়া। এই বয়ঃসন্ধিকালে মানসিক পরিবর্তন তো আসেই সঙ্গে বিরাট পরিবর্তন আসে মানব শরীরেরও । চিকিৎসকদের মতে, মেয়েদের বয়ঃসন্ধিকাল, ছেলেদের চাইতে কিছুটা আগেই শুরু হয়। মূলত ৯ থেকে ১৪ বছরের মধ্যে যে কোনও সময় তা হতে পারে। আর ছেলেদের ক্ষেত্রে বয়ঃসন্ধিকাল আসে গড়ে ১১ থেকে ১৭ বছর বয়সের মধ্যে। বয়ঃসন্ধি দেখা দেওয়ার চার বছরের মধ্যেই মেয়েরা তাদের উচ্চতা এবং প্রজনন ক্ষমতা সম্পূর্ণভাবে লাভ করে, অন্যদিকে ছেলেদের ক্ষেত্রে এই পরিপূর্ণতা আসলে সময় লাগে ছ’বছর অব্ধি। বয়ঃসন্ধির সূচনা হয় GnRH এর উচ্চ স্পন্দনের মাধ্যমে, যা যৌন হরমোনের ক্ষরণ বাড়ায়।

বয়ঃসন্ধিকালে মানসিক পরিবর্তন এর সঙ্গে-সঙ্গে ছেলে ও মেয়ের শারীরিক পরিবর্তনও লক্ষণীয়

ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা আগে বয়ঃসন্ধিতে পা দেয়। মেয়েদের শারীরিক পরিবর্তন গুলি যেমন দেহে নারী-সুলভ বৈশিষ্ট ফুটে ওঠা, হাত, পা, নিতম্ব ইত্যাদিতে মেদ জমা হওয়া ইত্যাদি দেখা দেয়। স্তন উন্নত হয়ে ওঠে, মানসিক পরিবর্তন দেখা দেয়, কণ্ঠস্বরও পরিণত হয়ে সরু হয়ে ওঠে। ঋতুস্রাব শুরু হয়ে যায়৷

বয়ঃসন্ধিকালে মেয়েদের পরিবর্তন

অন্যদিকে ছেলেদের ক্ষেত্রে যে শারীরিক পরিবর্তন হয় সেখানে তাদের কণ্ঠস্বর ভারী হয়ে ওঠে। গোঁফের রেখা স্পষ্ট হয়। শরীরে লোম দেখা যায়। দেহের মধ্যে বীর্য বা শক্তি সৃষ্টি হয় এবং একটি বড় রকম মানসিক পরিবর্তন ঘটে।

শারীরিক এবং মানসিক পরিবর্তনের কারণে এই সময়ে ছেলেমেয়েরা প্রায়ই নিয়ে ফেলে ঝুঁকিপূর্ণ কোনো পদক্ষেপ৷ তাই বন্ধু হয়ে পাশে থেকে হাতটা শক্ত করে ধরে থাকুন আপনার সন্তানের৷

কোন কোন বিষয় গুলি মাথায় রাখবেন?

  • টিনএজাররা এমন অনেক কাজ করে যেগুলো বাবা-মায়ের ধারণার বাইরে। বন্ধুদের দেখে আসে পাল্লা দেওয়ার প্রবণতা, নিজেকে জাহির করার প্রবণতা, এবং সেই জন্য বাবা-মায়ের অলক্ষ্যে তাদের টাকাপয়সা নিতেও চেষ্টা করে অনেকে। সেই ব্যাপারে সতর্ক থাকুন, এবং বুঝতে পারলে বন্ধুর মতো তার ভুল টা ধরিয়ে দিন৷ আপনাদের রোজগার এবং সাংসারিক খরচ সম্বন্ধে তার মধ্যে ধারণা তৈরি করুন। এক্ষেত্রে রোজগারের গুরুত্ব সম্বন্ধেও সচেতন হবে সে৷
  • ছোটোবেলায় সে আপনাদের সাথে সব জায়গায় যেতে চাইতো মানেই যে বয়ঃসন্ধিতেও সেই ইচ্ছে টা থাকবে এমনটা নাও হতে পারে৷ এক্ষেত্রে তার জবাব যুক্তিপূর্ণ মনে হলে তার ইচ্ছেকে সম্মান করুন।
  • টিনএজে অন্য বন্ধুদের দেখে পার্টিতে যাওয়া, নাইট স্টে, ‘আমারও বয়ফ্রেন্ড বা গার্লফ্রেন্ড থাকতে হবে’— এই ধরনের চাহিদা তৈরি হয়। বাবা-মা সেগুলো মেনে না নিলে অনেক সময়ে সন্তান বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। টিনএজাররা নেশার কবলে পড়ছে, এমন উদাহরণ অজস্র। নেশায় জড়ানো তাদের কাছে বড় হওয়ার একটা ধাপের মতো। বন্ধুদের কাছে স্মার্টনেস দেখাতে কখন যে আসক্তি তৈরি হয়, সেটাই বোঝা যায় না। ছেলেমেয়ের মধ্যে এই ধরনের পরিবর্তন দেখলেই সঙ্গে সঙ্গে তাকে ভুল টা বলুন, প্রয়োজনে শাসন করুন, কিন্তু কখনওই গায়ে হাত তুলবেন না৷
বয়ফ্রেন্ড বা গার্লফ্রেন্ড
  • কেরিয়ারের জন্য এই সময়টা অত্যন্ত জরুরি। পড়াশোনা হোক বা কেরিয়ার, কোনোকিছু নিয়েই সরাসরি তাকে খুব জোর দেবেন না৷ বরং এক্ষেত্রে না করলে কি কি ভালো বা খারাপ হতে পারে, সেইগুলি গল্পের ছলে তাকে বলুন৷ বাড়ির ছোটোখাটো কাজের দায়িত্ব তাকে দিন।
  • বয়ঃসন্ধিই ব্যক্তিত্ব তৈরির আদর্শ সময়। পারিবারিক বিভিন্ন কাজ, অনুষ্ঠান, বেড়াতে যাওয়া এমনকি যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ব্যাপারেই তার মতামত নিন। তাতে আপনাদের প্রতিও তার সম্মান বাড়বে এবং নিজের কাজের প্রতিও দায়িত্ববোধ বাড়বে। 
  • বয়ঃসন্ধিতে শারীরিক সম্পর্কের প্রতি আগ্রহ জন্মায়। অনেকেরই সন্তানের সেক্স এডুকেশন নিয়ে এখনও নানা ছুতমার্গ রয়েছে। কিন্তু অভিভাবকেরা সন্তানের কাছ থেকে যেটা চেপে যাচ্ছেন, সেটা জানার জন্য তারা অন্য পথ অবলম্বন করছে, বাড়ছে পর্ণ অ্যাডিকশন৷ সেটা আরও বেশি ক্ষতি করছে ছেলেমেয়েদের। এর চেয়ে আপনারাই খোলাখুলি কথা বলুন ওদের সাথে। অপরিণত বয়সে যৌন সম্পর্ক কতটা ক্ষতিকারক হতে পারে সেটা বুঝিয়ে বলুন।
বয়ঃসন্ধিতে শারীরিক সম্পর্ক

বয়ঃসন্ধিকালে মানসিক পরিবর্তন স্বাভাবিক, এই সময় ছেলে-মেয়েরা এমন কিছু আচরণ করে যা অস্বাভাবিক হলেও ওদের বয়সে স্বাভাবিক তাই বন্ধুত্ব স্থাপন করুন, বন্ধু হয়ে উঠুন সন্তানের। মনে রাখবেন একমাত্র আপনিই সন্তানের ব্যক্তিত্বের ভিত্তি সুদৃঢ় করে তাকে একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ উপহার দিতে পারেন।

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on telegram
Share on whatsapp
সাবস্ক্রাইব করুন

স্বাস্থ্য সম্পর্কিত বিভিন্ন খবর, তথ্য এবং চিকিৎসকের মতামত আপনার মেইল বক্সে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন.