ফাইব্রয়েড বা জরায়ুর টিউমার কেন হয় ? লক্ষণ ও চিকিৎসা

সাধারন ভাষায় ফাইব্রয়েড হল জরায়ুর টিউমার, যা প্রধানত মহিলাদের ইউটেরাস বা জরায়ুতে তৈরি হয় এবং ধীরে ধীরে জরায়ুর বাইরের ও ভিতর প্রাচীর বরাবর ছড়িয়ে পড়ে। এগুলো আকারে কখনো ছোট বা বড় হয়ে থাকে এবং এর থেকে তলপেটে ব্যাথা বা স্বাভাবিকের থেকে বেশি ঋতুস্রাবের সম্ভাবনা থাকে। অনেকসময় ইউটেরাসে ফাইব্রয়েড থাকলেও তার কোনো যথাযথ লক্ষণ দেখা যায়না অর্থাৎ শরীরে কোনোপ্রকার ব্যাথা বা অস্বস্তি হতে দেখা যায়না। তবে অনেকসময় এর উপসর্গগুলি এতটাই অস্বাভাবিক হয়ে থাকে যা সঠিক চিকিৎসা না করলে পরবর্তীকালে তা থেকে গর্ভধারণে অসুবিধা, ওজনবৃদ্ধি ইত্যাদি সমস্যাগুলি হতে পারে। যদিও ফাইব্রয়েড বা জরায়ুর টিউমার কেন হয় বা এর উৎস কি তা নিয়ে এখনো কোন সঠিক তথ্য পাওয়া যায়নি।

ফাইব্রয়েড বা জরায়ুর টিউমারের এর প্রকারভেদ

১) ইন্ট্রামিউরাল ফাইব্রয়েড: এই ধরনের টিউমার মহিলাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পরিমানে দেখা হয়। এটি জরায়ুর ভিতরের প্রাচীরে দেখা যায় এবং এর আকার বেশ বড় হয়। অনেক সময় এর আকার এতটাই বৃদ্ধি পায় যে পেটের একাংশে ফোলা ভাব স্পষ্টতই লক্ষ্য করা যায়।

২) সাবসেরাস ফাইব্রয়েড : জরায়ুর বহিঃপ্রাচীরে  হয়, যাকে “সেরোসা” বলা হয়ে থাকে। এটি আকারে বৃদ্ধি পেলে জরায়ুর আকার বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

৩) সাবমিউকাস ফাইব্রয়েড : জরায়ুর মধ্য কোশপ্রাচীরে হয়ে থাকে, এই ধরনের ফাইব্রয়েড খুব কম সংখ্যক মহিলাদের মধ্যেই দেখা যায়।

types of uterine fibroids

ফাইব্রয়েড বা জরায়ুর টিউমার কেন হয় ?

ফাইব্রয়েড ইউটেরাস বা ফাইব্রয়েড বা জরায়ুর টিউমার কেন হয় তা বলা মুশকিল তবে নিম্নলিখিত বিষয়গুলি জরায়ুর টিউমার গঠনে বিশেষ ভূমিকা রয়েছে বলে অনুমান করা হয়।

  • জরায়ু থেকে প্রধান দুটি হরমোন যথা ইস্ট্রোজেন এবং প্রজেস্টেরন ক্ষরিত হয়, এই হরমোনগুলি যেমন প্রতিমাসে নিয়মিত পিরিয়ড সৃষ্টির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে তেমনি ফাইব্রয়েড সৃষ্টির ক্ষেত্রেও বিশেষ ভাবে দায়ী করা হয়।
  • ফাইব্রয়েড অনেকসময় বংশগত হয়ে থাকে অর্থাৎ পরিবারে আগে যদি কারোর থেকে থাকে তবে হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি থাকে।
  • প্রেগনেন্সির কারনে শরীরে ইস্ট্রোজেন এবং প্রজেস্টেরন এর মাত্রা বৃদ্ধি পায়, তাই এই সময়ে ফাইব্রয়েড সৃষ্টি হতে পারে এবং বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ফাইব্রয়েড এর ঝুঁকি কি কি হতে পারে
jorayur tiumar

এছাড়াও বিশেষ কিছু ফ্যাক্টর থাকলে মহিলাদের মধ্যে এই রোগ হওয়ার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়। গর্ভবতী মহিলাদের ফাইব্রয়েড বা জরায়ুর টিউমার হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাছাড়া ৩০ বছর বয়সে বা তার পরে ফাইব্রয়েড হতে দেখা যায়, এবং অতিরিক্ত ওজন বৃদ্ধির ফলেও এটি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ফাইব্রয়েড যদি পরিবারের কারোর অর্থাৎ মা, ঠাকুমা বা দিদি –র মধ্যে হয়ে থাকে তাহলে পুনরায় এই রোগটি হওয়ার ঝুঁকি থাকতে পারে।

ফাইব্রয়েড বা জরায়ুর টিউমার এর লক্ষণ কি কি হতে পারে ?  

ফাইব্রয়েড এর লক্ষণ মূলত নির্ভর করে টিউমারের সংখ্যা এবং আকারের উপর, যেমন সাবমিউকোসাল ফাইব্রয়েড এর  ফলে ঋতুস্রাবের সময় অতিরিক্ত রক্তপাত হতে দেখা যায় এবং যার থেকে এবং গর্ভধারনে সমস্যা দেখা যায়।

 যদি টিউমারের আকার ছোটো থাকে বা কেউ মেনপজে পৌঁছে গিয়ে থাকেন তাহলে সাধারণত ফাইব্রয়েড এর লক্ষণ অনুভব করা যায় না। ফাইব্রয়েড অনেকক্ষেত্রে মেনপজে এসে বা তার পরে ধীরে ধীরে নিজে থেকেই কমে যায়। কারণ হিসেবে বলা যায়, মেনপজে প্রধান দুটি স্ত্রীজনিত হরমোন ইস্ট্রোজেন এবং প্রজেস্টেরন এর মাত্রা কমে আসে ফলে তা ফাইব্রয়েড এর বৃদ্ধিকে প্রভাবিত করতে পারেনা।

সংক্ষেপে লক্ষণগুলি উল্লেখিত করা হলঃ

মেয়েদের মাসিক এর সমস্যা
  •  ঋতুস্রাবের সময় অতিরিক্ত রক্তপাত এবং অনেকসময় তাতে জমাট বাধা রক্ত থাকে।
  • তলপেট বা কোমরে ব্যাথা
  • ঋতুস্রাব বা পিরিয়ডের সময় পেট ব্যাথা বা খিঁচুনি
  • যৌনমিলনের সময় ব্যাথা বা অস্বস্তি
  • অনেকক্ষেত্রে পিরিয়ড স্বাভাবিকের থেকে অনেক বেশিদিন ধরে চলতে থাকে
  • পেটের নিচের দিকে ব্যাথা বা চাপ সৃষ্টি হয়
ফাইব্রয়েডর চিকিৎসা কিভাবে করা যেতে পারে ?

ফাইব্রয়েড এর লক্ষণ অনেকসময় বোঝা যায় আবার অনেকসময় অনুভুত হয়না। তবে উপোরক্ত লক্ষণগুলি যদি দেখা যায় তবে তৎক্ষণাৎ একজন ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত। যদি ডাক্তার কিছু অস্বাভাবিক বুঝে থাকেন তবে ইউ.এস.জি এবং পেলভিক এম.আর.আই করার পরামর্শ দিতে পারেন।

ওষুধ দিয়ে

চিকিৎসা হিসেবে বেশ কিছু হরমোন জাতীয় ওষুধ দেওয়া হয় যা মূলত যথা ইস্ট্রোজেন এবং প্রজেস্টেরন হরমোনের মাত্রা কে নিয়ন্ত্রন করে টিউমারে আকারকে সঙ্কুচিত করে রাখে।

ব্যাথা কমাতে anti-inflammatory pain relievers, যেমন Ibuprofen এর মতন ট্যবলেট দেওয়া হয়।

অনেক সময় জন্ম নিয়ন্ত্রক পিল বা বড়ির ব্যাবহার ও করা হয়।

সার্জারি

জরায়ুর টিউমারের প্রাথমিক স্তরে সার্জারির বিশেষ কোনো প্রয়োজন হয় না, তবে কিছুক্ষেত্রে যদি ফাইব্রয়েডের আকার এবং পরিমান বৃদ্ধি পায় তাহলে সার্জারি সাহায্য নেওয়া হয়  , যাকে ডাক্তারি ভাষায় মায়োমেকটমি (myomectomy)  বলা হয়ে থাকে।

Surgery

অ্যাবডোমিনাল মায়োমেকটমির ক্ষেত্রে তলপেট চিরে জরায়ুর থেকে ফাইব্রয়েডগুলিকে বা টিউমারকে কেটে আলাদা করা হয়, যদিও এই একই জিনিস লেপারোসকপির মাধ্যমেও করা হয়ে থাকে অর্থাৎ বড়ো আকারে পেট না চিরেও ছোট ছিদ্রের মাধ্যমেও টিউমারটি কেটে বাদ দিয়ে বাইরে বের করে আনা হয়।

জরায়ুর টিউমার হলে কি কি বিষয় মাথায় রাখা জরুরী ?

সধারনত ফাইব্রয়েড যদি প্রাথমিক স্তরে থাকে তাহলে চিন্তার কোন কারণ থাকে না, তবে ধীরে-ধীরে এর আকার বাড়তে থাকলে ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। গর্ভবতী মহিলাদের নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলা উচিৎ, কারন এই সময়ে মহিলাদের বিভিন্ন  সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। যারা গর্ভধারণ করতে ইচ্ছুক তাদের আগে থেকে ডাক্তারের সাথে এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে নেওয়া একান্ত আবশ্যিক।

1 Comment

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *