Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on telegram
Share on whatsapp

রেড ভলান্টিয়ার্স : রাজ্য জুড়ে করোনা যুদ্ধে নতুন স্তম্ভ

দেশ জুড়ে আছড়ে পড়েছে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ৷ স্বজন হারানোর আর্তনাদে ভেঙেচুরে যাচ্ছে মানসিক স্থিতি। একবছরেরও বেশি সময় ধরে প্রাণ বাঁচানোর লড়াই করে চলেছেন ডাক্তার, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা৷ পিছিয়ে যাই আজ থেকে মাস খানেক আগে৷ পশ্চিমবঙ্গের কোভিড গ্রাফ তখন অস্বাভাবিকভাবে ঊর্ধ্বমুখী। মাঠে নামলেন একঝাঁক তরুণ প্রজন্ম। ‘মানুষ’ হিসেবে মানুষের স্বার্থে লড়াই করতে নিজেদের প্রাণ বাজি থেকে নেমে পড়লেন ময়দানে। অক্সিজেন হোক বা অ্যাম্বুলেন্স, প্রয়োজনীয় ওষুধ পৌঁছে দেওয়া হোক কিম্বা হাসপাতালের বেডের ব্যবস্থা। একটা ফোনেই পৌঁছে যাচ্ছেন তারা আপনাদের দরজায়। এরা ‘রেড ভলান্টিয়ার’। মানুষের সেবার ক্ষেত্রে যারা খুঁজছেন না কোনো রাজনীতির রঙ৷ নিজেদের সাধ্যমতো পৌঁছে যাচ্ছেন প্রতিটি অসহায় মানুষের ঘরে। ফেসবুকের পাতায় চোখ রাখলে দেখা যায় ভাইরাল হয়ে ঘুরছে প্রতিটি অঞ্চলের রেড ভলান্টিয়ারদের নম্বর৷ চব্বিশ ঘন্টা খোলা থাকছে ফোন। রাত দু’টো হোক কিম্বা দুপুর দু’টো, তাদের স্বেচ্ছাশ্রম কিন্তু নিরবিচ্ছিন্নই।

রেড ভলান্টিয়ার্সরা কিভাবে সামলে চলেছেন এই সবটা?

আমরা কথা বলেছিলাম তাদের সাথে। হেলথ ইনসাইড কে জানালেন তাদের অভিজ্ঞতার কথা, তাদের স্বেচ্ছাশ্রমের ইতি বৃত্তান্ত।
কল্যাণী বিধানসভার এবারের নির্বাচনে বামফ্রন্টের মনোনীত প্রার্থী তথা রেড ভলান্টিয়ার সবুজ দাস জানালেন, ” করোনাকালে সবচেয়ে বড় যে সমস্যাটা দেখা দিচ্ছে তা হলো সামাজিক সমস্যা। সামাজিক ভাবে এমনকি নিজেদের বাড়িতেও বয়কট করা হচ্ছে করোনা আক্রান্ত রোগীদের। খবর পেলেই তাদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছি আমরা। যাদের শারীরিক অবস্থা বেশি খারাপ, কোভিড হাসপাতালে সেই মুহূর্তে বেড না পেলেও অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করে তাদের সংশ্লিষ্ট এলাকার হাসপাতালে আপৎকালীন বিভাগে ভর্তির ব্যবস্থা করছি৷ সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যবস্থা করা হচ্ছে অক্সিজেনেরও, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত রেড ভলান্টিয়ার্সরা অক্সিমিটার দিয়ে স্যাচুরেশন মেপে অক্সিজেন সিলিন্ডার সেট করে দিচ্ছেন হোম আইসোলেশনে থাকা রোগীদের৷

ভলান্টিয়ার্স 1

এছাড়াও সামাজিক ভাবে যারা করোনা আক্রান্ত রোগীদের বয়কট করছেন, তাদের সচেতনতার জন্যও বাড়ি বাড়ি গিয়ে তাদের বোঝাচ্ছি, কিভাবে সাবধানতা অবলম্বন করে তারা আক্রান্ত মানুষের পাশে থাকবেন। সবাইকে বলছি আপনারা শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখুন, সামাজিক দূরত্ব নয়। আক্রান্তদের খাবার, ওষুধ ছাড়াও যারা দুঃস্থ মানুষ যাদের জন্য বিনামূল্যে ওষুধ, খাবার, এবং টেলিমেডিসিনের ব্যবস্থা করছি এমনকি বাড়ি, দোকান বাজার রাস্তাঘাট স্যানিটাইজেশনও করছে আমাদের রেড ভলান্টিয়ার্স। এছাড়াও গত বছর করোনাকালের শুরু থেকেই করা হচ্ছে রক্তের ব্যবস্থা, চারিদিকে ব্লাড ব্যাঙ্কে রক্তের হাহাকার। মানুষকে তো আমরা রক্তের অভাবে মরতে দিতে পারিনা৷ ধারাবাহিক ভাবেই এই কাজ করে চলেছে রেড ভলান্টিয়ার।

প্রশাসন বা সাধারণ মানুষের সাহায্য কতটা পাচ্ছে রেড ভলান্টিয়াররা?

” স্বাস্থ্য পরিষেবা কি হচ্ছে আমরা জানিনা। কখনও কখনও প্রশাসনের সাহায্য পাচ্ছি, কখনও পাচ্ছিনা৷ সব সময় প্রশাসনেরও কিছু করার উপায় থাকেনা, তাদেরও অনেক দায়বদ্ধতা আছে। আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে বাড়ছে বেডের আকাল। কোথায় যাবে মানুষ? তবে পাশে দাঁড়াচ্ছেন সাধারণ মানুষ। আশ্বাস দিচ্ছেন সাহায্যেরও। তবে তাদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই নিজেদের স্বাস্থ্যের অধিকার কে বুঝে নেওয়ার জন্য এবং ফ্রিতে ভ্যাক্সিনের জন্য আবেদন করতে হবে। মানুষই শেষ কথা বলে, মানুষই ইতিহাস তৈরি করে।”

নদীয়ার গয়েশপুরে পৌর অঞ্চলে ওয়ার্ড ভিত্তিক নিযুক্ত হয়েছেন রেড ভলান্টিয়ার্স। রয়েছে একটি কেন্দ্রীয় কমিটিও। আমরা কথা বলেছিলাম ডিওয়াইএফআই এর গয়েশপুর লোকাল কমিটির সম্পাদক জয় হালদারের সাথে। তিনি জানালেন, “প্রথম লকডাউন থেকেই আমাদের ১৮টি ওয়ার্ডে সক্রিয় রয়েছেন রেড ভলান্টিয়াররা। বর্তমানে সংখ্যাটা পঞ্চাশ। এলাকায় বহু বাড়িতেই সকলে করোনা আক্রান্ত, আমরা তাদের টেস্ট করানোর ব্যবস্থা করছি, প্রয়োজনে করা হচ্ছে হাসপাতালে বেডের ব্যবস্থাও। ওষুধ খাবার পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি হচ্ছে বাড়ি স্যানিটাইজেশন, সরাসরি হাসপাতালে গিয়ে দেওয়া হচ্ছে প্রতিদিন রক্তের যোগানও। পিপিই কিট পরে রোগীদের হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছেন আমাদের রেড ভলান্টিয়াররা। এতে প্রয়োজন হচ্ছে অর্থেরও। সাধারণ মানুষ সাহায্যের হাত বাড়াচ্ছেন, কেউ দিচ্ছেন পিপিই কিট, কেউ গ্লাভস, কেউ বা মাস্ক স্যানিটাইজার, এবং তা দলমত নির্বিশেষে। “

সরাসরি মাঠে নেমে কাজ করা রেড ভলান্টিয়ারদের বাইরেও রয়েছে একটি নেটওয়ার্ক। যারা নিজেদের পরিচয় দিচ্ছেন ‘ভারচুয়াল রেড ভলান্টিয়ার্স’ নামে। সোশ্যাল মিডিয়ায় রেড ভলান্টিয়ার্সদের গ্রুপে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ সাহায্য চেয়ে পোস্ট গুলি আসে, সেগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করেন তাঁরা। যোগাযোগ করিয়ে দেন সংশ্লিষ্ট এলাকার রেড ভলান্টিয়ারদের সাথে৷ আমরা কথা বলেছিলাম ফেসবুকে বহুল ব্যবহৃত ‘Red Volunteers Group‘ এর অ্যাডমিন অবিন মিত্র-র সাথে। হেলথ ইনসাইড কে তিনি জানালেন, ” ২০২০ তে প্যান্ডেমিকের শুরুতে আচমকা লকডাউনের শুরু থেকেই জন্ম এই গ্রুপের। তখন থেকেই এলাকা ভিত্তিক কাজ শুরু করেন এসএফআই এবং ডিওয়াইএফআই এর কর্মীরা। বাড়ি বাড়ি বাজার, খাবার, ওষুধ পৌঁছে দিত তারা। তাদের একটা প্ল্যাটফর্ম দেওয়ার জন্যই এক ছাতার নীচে এনে এই সংগঠনের নাম দেওয়া হয় রেড ভলান্টিয়ার্স।

রেড-ভলান্টিয়ার্স-Red-Volunteers-Digital-Team
Digital warriors of Red Volunteers

শুধুমাত্র শহরাঞ্চলেই না, বিভিন্ন মফস্বল সহ বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, ঝাড়গ্রাম, নকশালবাড়ি, মাটিগাড়ার মতো গ্রামীণ এলাকাতেও এরা চালিয়েছেন কমিউনিটি কিচেন। কোনো জায়গায় ১০, ২০ টাকার বিনিময়ে, কোথাও বা বিনামূল্যে হয়েছে খাদ্য বিতরণ৷ এরপর আসে করোনার দ্বিতীয় পর্যায়ের ভয়ংকর ঢেউ৷ শহর ছাপিয়ে গ্রামের পর গ্রাম আক্রান্ত। সাহায্য চেয়েআমাদের কাছে প্রচুর পরিমাণে ফোন আসতে শুরু করে আবারও। গত বছর রেড ভলান্টিয়ার্সের সংখ্যা ছিল ৭-৮ হাজার যা, মাত্র কয়েকদিনে ছাড়িয়ে গেছে এক লক্ষ। আমাদের গ্রুপ এবং অফিশিয়াল পেজের মাধ্যমে সারাদিন ৫-৬ হাজার সাহায্যের আবেদন আসতে থাকে। এবং যেহেতু এটা এলাকা ভিত্তিক, তাই সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষরা বুঝেছেন যে তাদের এই এলাকার ছেলেমেয়েদের ডাকলেই তারা কাছে পাবেন যেকোনো প্রয়োজনে৷ রোগের প্রকোপ বাড়ায় মানুষের প্রয়োজন বেড়েছে বেশি, তাই রেড ভলান্টিয়ার্সদের কাজের ব্যপ্তিও বর্তমানে বৃদ্ধি পেয়েছে।

রেড-ভলান্টিয়ার্স-Red-Volunteers-2

বর্তমানে রেড ভলান্টিয়ার্স সরকারের একটি বিকল্প প্ল্যাটফর্ম হয়ে দাঁড়িয়েছে৷ তাদের এখন মানুষ ত্রাতা হিসেবে ভাবছেন, ভরসা করছেন ; এবং এটাই আমাদের পুঁজি, কাজের রসদ। শুধুমাত্র নিজের জীবন বাজি রেখে কোভিড রোগীদের সাহায্যই নয় আমাদের সদস্যরা, বাড়িতে মারা যাওয়া কোভিড রোগীদের সৎকার অব্ধি করছেন, যেখানে কেউ এগিয়ে আসছেন না ভয়ে বা আতঙ্কে, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে নিজের মানুষও নয়। সাধারণ মানুষ বিভিন্ন ভাবে উপকৃত যেভাবে তাদের শুভকামনা আমাদের গ্রুপে লিখে তাদের মতামত জানাচ্ছেন তাতে আমরা সত্যিই আপ্লুত৷ দেশের অন্যান্য রাজ্যে বা বিদেশে প্রবাসী ভারতীয়রা তাদের প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে। রেড ভলান্টিয়ার্স শুধু আজ নয়, পশ্চিমবঙ্গে যখনই জরুরি অবস্থা এসেছে তারা ঝাঁপিয়ে পড়েছেন মানুষের স্বার্থে, তা মহামারী হোক বা বন্যা। তবে তখন তাদের গায়ে ‘রেড ভলান্টিয়ার্স’ নাম টা ছিল না। ১৯৪৩-৪৪ এর মহামারীতেও এও অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির তার সদস্যদের কাছে আবেদন করেছিলেন মানুষের স্বার্থে কাজ করার জন্য। যেহেতু নিজের জীবন বাজি রেখে কাজ করছেন, তাই তাদের প্রয়োজনীয় পিপিই কিট, গ্লাভস ইত্যাদি প্রশাসনের তরফে দেওয়ার আর্জি জানাই৷”

রেড-ভলান্টিয়ার্স-Red-Volunteers

আমরা কথা বলেছিলাম আরেকজন ভারচুয়াল রেড ভলান্টিয়ার তথা ‘Red Volunteers’ গ্রুপের অ্যাডমিন স্বর্ণাভ-র সঙ্গে। স্বর্ণাভ জানান, ” আমাদের কাজ টা এতদিন পরিচিতদের সাহায্য করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল৷ কিন্তু ইলেকশনের শেষ দিকে যখন করোনা ভয়াবহ রূপ নেয়, আমরা যুদ্ধকালীন তৎপরতায় সদস্যদের সাথে কো-অর্ডিনেট করি, এবং এই গ্রুপ টা তৈরি হয় মানুষের স্বার্থে।

রেড ভলেন্টিয়ারস বামপন্থী রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাসী, তাই রাজনৈতিক রঙ না দেখে প্রত্যেকটা মানুষকে স্বেচ্ছায় সহযোগিতা করছে। রেড ভলেন্টিয়ারদের নিয়ে দ্বিতীয় গ্রুপটি তৈরী ইলেকশানের একদম শেষ প্রহরে, যদিও তার অনেক আগে থেকেই রেড ভলেন্টিয়ারসরা ময়দানে রয়েছেন। তবে তখন আমরা স্থানীয় স্তরে কাজ করে গিয়েছি, ব্যাপক মাত্রায় তথ্য আদানপ্রদানের জন্য এড়িয়া ইন্ট্রিগ্রেশনের কথা ভাবিনি। তাই অধিক মাত্রায় প্রচার হয়নি।

ধণতান্ত্রিক প্রচার ব্যবস্থা আর সমাজতান্ত্রিক প্রচার ব্যবস্থার মধ্যে এটাই পার্থক্য। ধণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রচারের ঢক্কানিনাদ হয় কাজের কাজ কিছুই হয়না। এদিকে, সমাজতান্ত্রিক প্রচার ব্যবস্থায় আমরা আগে কাজের দিকে মন দিই, পরে প্রসার। প্রসার বাড়লে প্রচার বাড়বেই।
কাজ হলে মানুষ নিজেই প্রচার করবেন, মানুষের ইতিহাস মানুষই লেখেন।

জেলায় জেলায় এলাকা ভিত্তিক রেড ভলান্টিয়ারদের সংযোগ করাই আমাদের কাজ৷ আর যে সমস্ত জায়গায় রেড ভলান্টিয়াররা এখনও নেই, সেখানেও মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছি অন্যান্য যোগাযোগের মাধ্যমে৷ মূলত দুই ধরণের মানুষ আমাদের সাথে যোগাযোগ করছেন, এক যারা এলাকায় নতুন এসছেন এবং কাউকে চেনেন না, তারা ফেসবুকে পোস্ট দিচ্ছেন। আর দুই, সেই সমস্ত রিমোট এরিয়া, যেখানে কোনো পরিষেবা পৌঁছাতে পারছেনা৷ সেখানে আমরা আমাদের রাজনৈতিক দলের মারফত প্রয়োজনীয় সাহায্য পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করি। মানুষকে সঠিক তথ্য ও পরিষেবা পৌঁছে দেওয়া এবং মানুষের সাথে মানুষের সংযোগ-সমন্বয়ই আমাদের মূল লক্ষ্য। “

আর্ত মানুষের সেবায় পথে নামা রেড ভলান্টিয়ার্সের এখন একটাই মন্ত্র,
“মানুষ বড় একলা, তুমি তাহার পাশে এসে দাঁড়াও,
এসে দাঁড়াও, ভেসে দাঁড়াও এবং ভালোবেসে দাঁড়াও,
মানুষ বড় কাঁদছে, তুমি মানুষ হয়ে পাশে দাঁড়াও।”

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on telegram
Share on whatsapp
সাবস্ক্রাইব করুন

স্বাস্থ্য সম্পর্কিত বিভিন্ন খবর, তথ্য এবং চিকিৎসকের মতামত আপনার মেইল বক্সে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন.