কোন কোন খাবার ও পানীয় গ্রহণ করলে আপনার অনিদ্রাজনিত সমস্যা কমবে ?

অনিদ্রাজনিত সমস্যা বা রাতে ঠিক করে ঘুম না হওয়া এখন ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়েছে। কিছু বছর আগেও যে সমস্যা ততটা ভয়াবহ ছিল না এখন সেটাই চিকিৎসকদের বেশ মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। কারণ রাতে সঠিক মাত্রায় ও পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়ার জন্য নানান শারীরিক জটিলতা দেখা দিচ্ছে। অনেক বড় বড় অসুখের নেপথ্য কারণ হিসেবে কাজ করছে এই অনিদ্রাজনিত সমস্যা। তাছাড়া ঠিক করে ঘুম না হলে সারাদিন মন মেজাজ ভালো থাকে না, যার প্রভাব পড়ে কাজকর্মে।

অনিদ্রাজনিত সমস্যা দূর করার জন্য নানান উপায় আছে। এর মধ্যে অন্যতম হল সঠিক খাদ্য ও পানীয় গ্রহণ করা। বেশ কিছু খাবার ও পানীয় আছে যা আপনি খেলে রাতে খুব ভালো ঘুম হবে। কারণ এগুলি নানান শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তন ঘটিয়ে মানুষকে ঘুমোতে সাহায্য করে। সেই সঙ্গে এগুলোর কোন‌ও পার্শ্ব প্রতিক্রিয়াও থাকে না। তাই চিকিৎসকরাও বহু ক্ষেত্রে অনিদ্রার সমস্যায় ভোগা ব্যক্তিকে এই সমস্ত খাবার ও পানীয় গ্রহণ করার পরামর্শ দেন।

অনিদ্রাজনিত সমস্যা কমবে নিম্নলিখিত খাবার ও পানীয় গ্রহণ করলে :-

১) আমন্ড :- বাদাম জাতীয় ড্রাই ফ্রুটের অন্তর্গত আমন্ড। এটি অনেকেই খেতে পছন্দ করেন, আবার অনেকে তেমন একটা খান না। কিন্তু জানেন কি আমন্ড আমাদের শরীরের কত উপকার করতে পারে? বাদাম জাতীয় এই খাবারটি ডায়াবেটিস, স্ট্রোকের সম্ভাবনা অনেকটা কমিয়ে দেয়। এমনকি এই অসুখগুলি থাকলেও তা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। সেইসঙ্গে আমাদের রাতে ভালোভাবে ঘুমিয়ে পড়তেও খুব সাহায্য করে আমন্ড। বাদাম জাতীয় এই আমন্ড আমাদের শরীরে ঘুমের জন্য প্রয়োজনীয় মেলাটোনিন হরমোনকে বেশি মাত্রায় নিঃসরণ হতে সাহায্য করে। সেই সঙ্গে শরীরে ম্যাগনেসিয়ামের পরিমাণ বৃদ্ধি করে। এই দুটো জিনিসই আমাদেরকে রাতে ঘুমোতে সাহায্য করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিদিন যদি ২৮ গ্রাম করে আমন্ড খাওয়া যায় তবে রাতে খুব ভালো ঘুম হবে।

২) টার্কি :- অনেকেই টার্কি খেতে পছন্দ করেন। মানে টার্কির মাংস। তবে বহু বাঙালি টার্কি ছুঁয়ে দেখেন না, তাঁদের কাছে সেই পরিচিত চিকেন ও মাটন‌ই ভালো। কিন্তু জানেন কি টার্কির মাংস আপনাকে রাতে একটা সুন্দর ঘুম দিতে ঠিক কতটা সাহায্য করতে পারে? টার্কির মাংসে ট্রাইটোফান অ্যামিনো অ্যাসিড থাকে, যা ঘুমের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় মেলাটোনিন হরমোন বেশি মাত্রায় শরীরের মধ্যে উৎপাদন করে। স্বাভাবিকভাবে বুঝতে পারছেন আমাদের রাতে ভালো ঘুমের পিছনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে টার্কির মাংস। তবে শুধু এখানেই নয়, ঘুমের সাহায্যের ক্ষেত্রে টার্কির মাংসের আর একটা গুরুত্বপূর্ণ অবদান হল রাতে শুতে যাওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগে আপনি যদি প্রতিদিন পরিমিত মাত্রায় এই মাংস খান সেক্ষেত্রে অটোমেটিক ক্লান্ত হয়ে পড়বেন। যা ঘুমের জন্য অত্যন্ত জরুরি। আসলে টার্কির মাংস আমাদের মস্তিষ্কে ঘুমের জন্য প্রয়োজনীয় ক্লান্তভাব তৈরি করে।

৩) ক্যামোমাইল চা :- এটি একটি ভেষজ চা। এতে বিপুল পরিমাণ অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে যা ইনসোম্যানিয়ার সমস্যা অনেকটাই কমিয়ে দিতে সক্ষম। সেইসঙ্গে নিয়মিত ক্যামোমাইল চা পান করলে আপনার মন থেকে অ্যাংজাইটি দূর হয়ে যাবে, ডিপ্রেশন কমাতেও অত্যন্ত কার্যকরী এই ভেষজ চা। বলা বাহুল্য, এই ডিপ্রেশন, অ্যাংজাইটি এগুলোই মানুষকে রাতে ভালো করে ঘুমোতে দেয় না। তাছাড়া ক্যামোমাইল চা রাতে ঘুমের জন্য আপনার মস্তিষ্ককে চিন্তামুক্ত করে হালকা আচ্ছন্ন করে তোলে। প্রতি রাতে বিছানায় শুতে যাওয়ার ঘণ্টাখানেক আগে এই বিশেষ ধরনের চা পান করলে একটা সুন্দর ঘুম নিশ্চিত।

৪) কিউই :- এই ফলে বিপুল পরিমাণ খনিজ থাকে। তাই নিয়মিত কিউই খাওয়া শরীরের পক্ষে সমস্ত দিক থেকেই অত্যন্ত উপকারী। এটি ঘুমের ক্ষেত্রেও প্রভূত মাত্রায় সাহায্য করে। কারণ কিউই ফলে থাকা সেরাটোনিন মস্তিষ্কের বিভিন্ন রাসায়নিককে নিয়ন্ত্রণ করে। এই রাসায়নিকগুলি আমাদের ভালো করে ঘুমোতে অনেকটা সাহায্য করে থাকে। বিশেষজ্ঞরা বলেন প্রতিদিন রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে মাঝারি সাইজের ১-২ টি কিউই ফল খেলে সুন্দর ঘুম হবে।

৫) টার্ট চেরি জুস :- এটি একটি হেলথ ড্রিঙ্ক। এতে বিপুল পরিমাণে ম্যাগনেসিয়াম ও পটাশিয়াম থাকে। এটি ইনসোম্যানিয়ার সমস্যা দূর করতে খুবই সাহায্য করে থাকে। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিদিন রাতে বিছানায় শুতে যাওয়ার আগে টার্ট চেরি জুস পান করলে ৮৪ মিনিট বেশি ঘুমানো সম্ভব হয় ।

৬) নির্দিষ্ট সামুদ্রিক মাছ :- স্যামন, টুনা, ম্যাকরেল, ট্রাউট এই ধরনের সামুদ্রিক মাছগুলিকে ফ্যাটি ফিস বলা হয়। এই মাছগুলিতে শরীরের জন্য উপকারী বহু উপাদান আছে। ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড, প্রচুর খনিজ, অ্যান্টিঅক্সিডেন্টে ভর্তি থাকে এগুলো। সঙ্গে থাকে বিপুল পরিমাণ ভিটামিন। নানান গবেষণায় দেখা গিয়েছে এই সামুদ্রিক মাছগুলি প্রতিদিন খেলে রাতে খুব ভালো ঘুম হয়। অনিদ্রাজনিত সমস্যা দূর হয় এবং সেই সঙ্গে শরীরে রক্ত সঞ্চালন অত্যন্ত ভালো মাত্রায় হতে থাকে, যা আমাদের ঘুমোতে অনেকটাই সাহায্য করে।

৭) ওয়ালনাট :- এটিও বাদাম জাতীয় এক ধরনের শুকনো ফল। বাংলায় আখরোট বললে সবারই কম বেশী চেনা লাগবে। ওয়ালনাটে প্রচুর পরিমাণে ম্যাগনেসিয়াম ম্যাঙ্গানিজ কপার ও ফসফরাস থাকে। সেই সঙ্গে থাকে শরীরের পক্ষে উপকারী ফ্যাটি অ্যাসিড ও বিপুল পরিমাণ অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। যার ফলে শরীর সমস্ত দিক থেকেই অত্যন্ত ভালো থাকে। ওয়ালনাটের খাদ্যগুণের জন্যই আমাদের শরীরে ঘুমের জন্য প্রয়োজনীয় মেলাটোনিন হরমোন অধিক মাত্রায় ক্ষরণ হয়। আর তাতেই রাতে বিছানায় শুলেই সুন্দর ঘুম হয়।

৮) প্যাশনফ্লাওয়ার চা :- এটিও একটি ভেষজ চা। এতে গামা অ্যামিনোবিউট্রিক অ্যাসিড আছে, যা রাতে ঘুমের গুণগত মান বাড়িয়ে দেয়। একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে, প্রতিরাতে শোয়ার আগে এই ভেষজ চা পান করলে ঘুম অনেক বেশি গভীর হয়।

৯) সাদা ভাত :- ঘরের সাদা ভাত। সাধারণ বাড়িতে আমাদের যে ভাত খাওয়া হয় তার কথাই বলা হচ্ছে। অনেকে স্বাস্থ্যের কথা ভেবে আজকাল ব্রাউন রাইস খান। শরীরের অন্যান্য অনেক উপকারের জন্য ব্রাউন রাইসের প্রয়োজন আছে। কিন্তু আপনি যদি অনিদ্রাজনিত সমস্যায় ভোগেন তবে রাতে সাদা ভাত খাওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে ব্রাউন রাইস, নুডলস এগুলো ছেড়ে পরিমিত মাত্রায় সাদা ভাত খেলে রাতে ঘুম অনেক ভালো হয়। তবে এক্ষেত্রে শুতে যাওয়ার অন্তত এক ঘণ্টা আগে এই ভাত খেতে হবে। তবেই সঠিক মাত্রায় ঘুমের জন্য তৈরি হয়ে উঠবে শরীর।

এছাড়াও দুধ, ঘি, মাখন, চিজের মত বেশ কিছু ডেয়ারি প্রোডাক্ট এবং কলা নিয়মিত খেলে রাতে ভালো ঘুম হয়।

সাবস্ক্রাইব করুন

স্বাস্থ্য সম্পর্কিত বিভিন্ন খবর, তথ্য এবং চিকিৎসকের মতামত আপনার মেইল বক্সে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন.